পূজা কনসেশন
পূজার ছুটিতে হরিহরবাবু বিদেশে বেড়াতে যাবেন। আশি টাকার | কেরানি, বিদেশে বড় একটা যাওয়া ঘটে না, এত বড় সংসার,
অতগুলি কাচ্ছা-বাচ্চা। তবু পূজা কনসেশন, সস্তায় টিকিট, হরিহরবাবু
স্থির করলেন, বাবা বৈদ্যনাথ দর্শন করতে যাবেন। বড়বাবুকে ধরে, সাহেবকে ধরে পনের দিনের ছুটি পাওয়া গেল। যাবার অন্তত সাতদিন আগে থেকে তােড়জোড়। যেখানে যত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, পরিচিত—সকলের কাছে চিঠি গেল। পাড়ার মুদির দোকান, কিনু স্যাকরা, কয়লাওয়ালা, ভৃগু পরামাণিক, নটবর ধােবাইত্যাদি সবাই জেনে গেল, হরিহরবাবু বিদেশে যাবেন।
সাতদিন আগে থেকে হরিহরের ঘুম নেই, স্নানাহারের সময় নেই। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বচসা, বাড়ির লােকের সঙ্গে বিবাদ গিন্নির সঙ্গে মনােমালিন্যতার কারণ তারা নাকি এতবড় একটা কাণ্ড-কারখানার দিকে যথেষ্ট মনােযােগ দিচ্ছে না। তিনি বললেন, কোন দিক সামলাই? আমি এত পেরে উঠব কেমন করে? গিন্নি বললেন, কিসের এত হুড়ােহুড়ি? এখনও ত অনেক দেরি!
দেরি! তােমার আর কি বল, আমার যে প্রাণ যায়। এত কেনাকাটা কে করবে? কিসের কেনাকাটা?শোনাে কথা বলে হরিহরবাবু মেঝের উপর বসে পড়লেন। তিনি একে মােটা মানুষ, এতবড় ভুড়ি, গত বছরে অসুখ থেকে উঠেছেন, তার উপরে এই পরিশ্রম।
মেয়েমানুষ, ওরা কি জানে, কতটুকু ওরা বােঝে, ওদের সাধ্য কতটুকু? যা করে সবই ত এই শর্মা! হরিহরবাবু বললেন, তােমার মতন কুড়ে হলে আর রেলগাড়িতে উঠতে হচ্ছে না। এই বলে আবার তিনি ছুটলেন।
পথ দিয়ে ছুটতে ছুটতে চললেন। চীনাবাজার থেকে ছেলেমেয়ের জুতাে, হাওড়ার হাট থেকে সস্তায় কাপড়, মুর্গিহাটা থেকে গায়ের জামা, চাদনি থেকে দু খানা বিলেতি কম্বল। মােট ঘাট, বাজার, চুপড়ি চাঙারি—সবসুদ্ধ প্রকাণ্ড এক বস্তা তিনি এনে হাজির করলেন।
বিদেশে বিভুয়ে যাবেন, সেখানে হয়ত ডাক্তার বৈদ্য নেই, হয়ত রাত-বিরাতে কোনও বিপদ ঘটতে পারে, এজন্য তিনি ঔষধপত্র কিনতে সুরু করলেন। জ্বরের জন্য কুইনিন, আমাশয়ে ক্লোরােডাইন, কলেরায় ক্যাম্ফর, সর্দির ইউক্যালিপ্টস অয়েল, কাসির তালের মিছরি, কাটাছড়ার টিনচার-আইডিন, ঘায়ের বােরােফ্যাক্স, জামবাক ইত্যাদি। রাত্রে পথে বেরােবার জন্য একটা টর্চ-লাইট।
সেখানে গিয়ে একটা সংসার পাততে হবে তা মনে আছে? —হরিহর বললেন।
গিন্নি বললেন—সে ত হবেই।
তবে চুপ করে আছ কেন? আচ্ছা, তােমার কি একটুও দুশ্চিন্তা হচ্ছে না? জানাে, সেই অজানা দেশে হয়ত কিছু পাওয়া যাবে না?
সে তখন দেখা যাবে।-বলে গিন্নি চলে গেলেন।
পরিশ্রমে হরিহর ঘর্মাক্ত, তবু তিনি চুপ করে থাকতে পারলেন না। ঠনঠনে থেকে তিনি এক প্রকাণ্ড চট কিনে আনলেন, তার সঙ্গে আনলেন একটা আমকাঠের বাক্স। তার মধ্যে থালা, বাটি, ঘটি, গেলাস, কড়া, খুন্তি, হাতা, বেড়ি, চাটু, হাঁড়ি, গামলা, ডেকচি—সব পুরলেন। সাহায্য করবার কেউ নেই, একাই সব করতে হল। এদিকে তেলের বাটি, নুনের কেঁড়ে, মশলার কৌটা, ঘিয়ের শিশি, শিল-নােড়া, চাকী-বেলুন, বঁটি-কাটারি—সব ঢােকালেন।
অতদূর-বিদেশে চাল ভাল পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ সুতরাং তেল-ঘি-নুন-চাল-ডাল-হলুদ প্রভৃতি সমস্তই তিনি কিনে আনলেন। কারও কথা তিনি শুনতে রাজি নন, বিদেশের অভিজ্ঞতা বাড়ির কারও নেই। এখন সবাই মুখটিপে হাসছে বটে, কিন্তু সেই দুর্দিনে এইসব বড়ই মিষ্টি লাগবে, একসময় তিনি গলা বাড়িয়ে বললেন, বলি শুনছ, ছােট ছেলেটার জন্যে কিছু দুধ নিতে হবে, সে দেশে হয়ত গরু নেই।
গিন্নি বললেন, গরু একটা এখান থেকে নিয়ে গেলে হয় না?
বলেছ ঠিক। বলে হরিহরবাবু মাথা নাড়লেন। যাই স্টেশনে গিয়ে একবার, জিজ্ঞেস করে আসি। বলেছ তুমি ঠিক।—তিনি গভীর চিন্তার বিমর্ষ হয়ে বেরিয়ে গেলেন।
পাড়ার লােক ডেকে বললে, হরিহরবাবু আপনার যাওয়া কি তবে ঠিক? | হরিহর বললেন, বাবা বদ্যিনাথের ইচ্ছে, আমার ত চেষ্টার ত্রুটি নেই।
কাল রাতে আপনার বাড়িতে অত গােলমাল হচ্ছিল কেন!
আরে ভাই এতবড় ব্যাপার কারও গা নেই। রাতজেগে আমি জিনিসপত্তর গােছাচ্ছিলুম।
আপনার বাড়িতে কারা এসেছিল? হরিহর বললেন, ওঃ তা বটে। এসেছিল আমার দুই শালা, বড় ভায়রাভাই, আর আমার ভাগ্নে। তাদের ডেকেছিলুম চিঠি লিখে, ওরা সবাই সামনে এসে দাঁড়ালে আমি এত পেরে উঠব কেন।
পাড়ার লােক বললে, আপনারা কজন যাবেন?
আমি, আমার স্ত্রী আর তিনটি ছেলেমেয়ে। আচ্ছা দেখুন বিনয়বাবু, আপনি একবার আসুন ত আমার ঘরে। আমার মাথা আর ঠিক নেই, দেখে যান ত আর কিছু দরকার লাগতে পারে কিনা? | বিনয়বাবু এসে দাঁড়ালেন। বললেন, সবই হয়েছে, বিছানা কিছু কম।
ওই শােনাে, ওগাে, কোথা গেলে? আমি তখনই বললুম। ঠিক ঠিক, সামনে অক্টোবর মাস, বটেই ত!
সেদিন সমস্তদিন হরিহর বিছানাপত্র গােছালেন। লেপ চারটে, বালিশ এগারােটা, কাথা ছ খানা, মাদুর তিনটে, তােষক পাঁচখানা, চাদর সাতখানা, সতরঞ্চি তিনখানা। এত বিছানা তার নিজের ছিল না। শালা শালী, বড়বােন, মাসতুতাে ভাই, মামা, পাশের বাড়ির বড় বৌ, বিনয়বাবুর স্ত্রী—সকলের কাছে পনেরাে দিনের কড়ারে বিছানাগুলি ধার করে এনে তিনি এক জায়গায় পাকার করলেন। জিনিসপত্র, মােট-ঘাট, পোঁটলা-পুঁটলি, চুপড়ি-চ্যাঙরি প্রভৃতিতে তার শােবার ঘর বােঝাই হয়ে উঠল।
রাত্রে ছেলেমেয়ে, স্ত্রীও নিজে ঘরে আর শােবার জাগয়া পেলেন
, সকলকে বাইরে শুইয়ে দু দিন রাত কাটাতে হল। প্রথম শরৎকালের গুমােট, সুতরাং ঘরের ভিতরকার ঠাসাঠাসি জিনিসপত্রে আরশে 'লা, পিপড়ে, মাকড়সা, বিছে ইত্যাদির উৎপাতে দুদিন আগে থেকে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে উঠল। নীচের দালান আগে থেকে উপরের ঘর পর্যন্ত অসংখ্য পুটলি, বস্তা, বাক্স, তােরঙ্গ, ব্যাগ, বিছানা মােটঘাট ইত্যাদিতেই আর পা বাড়াবার ঠাই রইল না।
গরুর গাড়ি না হলে এত জিনিসপত্র স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাবে না। অবশেষে হরিহরবাবু দুখানা গরুর গাড়ি বন্দোবস্ত করবার জন্য বেরুলেন।
ফিরে যখন এলেন দেখা গেল, আবার তার সঙ্গে একগাড়ি জিনিসপত্র। সেই অজানা দেশে হয় ত খাবার জল পাওয়া যায় না, সুতরাং প্রকাণ্ড দুটো ট্যাঙ্ক এল।
বড় একটিন কেরােসিন তেল, চোর ডাকাত তাড়াবার চারটে বড় বড় লাঠি, ছটা হারিকেন লণ্ঠন, তিনটে আলিগড়ের তালাচাবি, পাঁচটা বালতি, একরাশ খাম, পােস্টকার্ড-ডাকটিকিট, হিসাবের বড় একখানা জাবেদা খাতা, গােটাকয়েক হুঁকো-কলকে-তামাক-টিকে, একরাশি দডি, এমনি আরও কত কি। ধামা, চ্যাঙারি, থলে, বাক্স, ব্যাগ সমস্তই একে একে বােঝাই হয়ে উঠল।
পাড়ার বড় বৌ হরিহরের স্ত্রীকে ডেকে বললেন, এত জিনিসপত্র নিয়ে আপনারা কত দূরে যাবেন বৌদিদি? হরিহরের স্ত্রী হেসে বললেন, বিলেত!
অবশেষে যাবার দিন এল! বেলা বারােটায় ট্রেন, কিন্তু আগের রাত্রে হরিহর ঘুমালেন না। কেবল তাই নয়, পরদিন ভােরে জিনিসপত্র বাঁধা ছাঁদা করার ভয়। দেখিয়ে তিনি স্ত্রীকে জেগে থাকতে বললেন। ছেলেমেয়েদের চিমটি কেটে তিনি শেষরাত্রে ওঠালেন। গােলমাল ও চিৎকারে পাড়ার লােক সে রাত্রে জেগে কাটাল। ভােরবেলায় একদল মুটে দুখানা গরুর গাড়ি নিয়ে এসে হাজির। সকালবেলা নানাদিক থেকে আত্মীয়-স্বজন তার দরজায় উপস্থিত। পাড়ার লােক দল বেঁধে সারি সারি উপরের জানালায় ও বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেল।
সকালবেলা আহারাদির ব্যবস্থা যেমন-তেমন। ছেলেমেয়েদের দিকে যথেষ্ট মনােযােগ দেওয়ার অভাবে তারা দুদিন থেকে অযত্নে ও অনাহারে কাহিল হয়ে পড়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর বিবাদ, বিদেশে যাওয়ার এইসব হাস্যকর আয়ােজনে সাহায্য না করার জন্য হরিহর স্ত্রীর মুখ দেখছেন না। যাই হােক, কোন রকমে ভাতে-ভাত খেয়ে সেদিনের মত কাজ সারা হল। | কুলিদের সাহায্যে বেলা নয়টা নাগাদ হরিহর দু খানা গরুর গাড়িতে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে তেত্রিশ কোটি দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে কপালে দইয়ের ফোটা একে, সিদ্ধিদাতা গণেশের চরণ সেবা করে জয় দুর্গা শ্রীহরি বলে যাত্রা করলেন। যাবার সময় তার ছােট শালাকে বললেন, আমি স্টেশনে গিয়ে জিনিসপত্র বুক করব, তুমি ভাই গিয়ে সকলের টিকিট কাটবে।
দেখ, এগারােটার মধ্যে অবশ্য পেছানাে চাই, পূজা কনসেশনের ভিড়, দেরি হলে আর জায়গা পাবে না। কালীপদ বললেন, কোন ভয় নেই, আমি ঠিক নিয়ে যাব, আপনি যান। সমস্ত পাড়া সচকিত করে, সকলকে হাসিয়ে, সকলের বিস্মিত দৃষ্টির উপর দিয়ে বাবা বৈদ্যনাথ যাত্রী হরিহর চৌধুরী মশায় আর-একবার দূর্গা বলে যাত্রা করলেন। গাড়ি দুখানা পাড়ার ভিতর দিয়ে ঘটর-ঘটর করে চলতে লাগল, আর আমাদের হরিহরবাবু সেই সকল জিনিসপত্রের উপরে বসে তার নতুন-কেনা গরুর গলার দড়িটা ধরে বসে রইলেন। গরুটা চলল গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে।
স্টেশনে এসে দেখা গেল গাড়ির দু ঘণ্টা দেরি। জিনিসপত্রের যথারীতি বিধি ব্যবস্থা করে হরিহর এক জায়গায় তার স্তুপাকার মালপত্রের পাশে এসে বসলেন। ক দিন থেকে পরিশ্রমের শেষ নেই, রাত কাটে জেগে, তার ওপর। মােটা মানুষ, এদিকে উপবাস চলেছে ক্লান্তিতে হরিহরের চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল। তিনি একটা বড় মােটের গায়ে হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। গাড়ির তখনও অনেক দেরি।
মাত্র কয়েক মিনিট আগে তার ঘুম ভাঙল। তখন ঘণ্টা দিয়েছে।
দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে হাঁকাহাঁকি করতেই কুলি এল। দশজন কুলি। সেই দশজন মিলে তার মালপত্র নিয়ে প্লাটফরম পেরিয়ে গাড়িতে তুললাে! গাড়ি ছাড়তে আর বিলম্ব নেই। কিন্তু কই তার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, তার শ্যালকেরা—তারা সব কোথায় ? হরিহর আকুল হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। হে নারায়ণ মধুসূদন, তুমি এই বিপদ থেকে উদ্ধার কর। | দুই এক মিনিট মাত্র বাকি, এমন সময় তার শালা ছুটতে ছুটতে এসে হাজির। চিৎকার করে বললে, আপনি করেছেন কি নামুন, নামুন, এটা যে তারকেশ্বরের গাড়ি—শিগগীর, আর সময় নেই, দেওঘরের গাড়ি আর তিনমিনিট, আসুন, শিগগীর আসুন।
পাগলের মত হরিহর প্লাটফরমে ঝাপ দিলেন। কুলি কুলি। শিগগীর মাল নামাও,—এই কুলি, কুলি!
আবার জিনিস-পত্র নামাতে হল। পনের জন কুলি, পনের টাকা বকসিস। অনেক ভাঙল মচকাল, নষ্ট হল। চালের বস্তা ফাটল, তেলের টিন ফুটো হল জলের কলসি ভেঙে ছত্রখান হল।
দেওঘরের ট্রেন ছাড়তে তখন এক মিনিট বাকি। ছুটতে গিয়ে বেচারি হরিহরের কাছা খুলে গেল। সেই অবস্থায় উদভ্রান্ত হয়ে উন্মত্ত হয়ে তিনি গাড়ি পর্যন্ত এসে পৌঁছলেন। কুলিরা তখনও জিনিসপত্র এনে পৌঁছতে পারেনি। শালক কেবল একটা বিছানা ও একটা কাপড়ের সুটকেস হিচড়ে এনে গাড়িতে তুলে দি, স্ত্রী স্বামীর হাত ধরে গাড়িতে তাঁধে তুলে নিয়ে বললেন, মরণ তােমার, থা, সব, তুমি উঠে এস। | গাড়ি ছেড়ে দিল।
হরিহর ফ্যাল ফ্যাল করে গলা বাড়িয়ে চেয়ে রইলেন। শ্যালকের হেপাজতে সমস্ত মালপত্র প্লাটফরমে পড়ে রইল।
এ ধরণের আরো মজার মজার গল্প পড়তে ক্লিক করুন Educational Blogs এবং Subscribe করে পাশেই থাকবেন।

0 মন্তব্যসমূহ