আতার পায়েস
বউদি বলেছে, সে বাড়ি এখন খালি, পূজোর ছুটিতে আমরা জনকতক স্বচ্ছন্দে কিছুদিন সেখানে কাটিয়ে আসতে পারি।
—এ তাে ভালাে খবর, মুশকিল কী হলাে?
—ভৈরববাবু বলেছেন, আমাদের সঙ্গে যদি একজন অভিভাবক যান তবেই আমাদের সেখানে থাকতে দেবেন।
-তােমার বড়দা আর বউদিকে নিয়ে যাও না?
—তা হবার জো নেই, ওরা মাইসাের যাচ্ছে। আপনিই আমাদের সঙ্গে চলুন সার। ক্লাস টেনের আমি, ক্লাস নাইনের নিমাই, নরেন, সুরেন—আর ক্লাস এইটের পিন্টু,—আমরা এই পাঁচজন যাবাে, আপনার কোনাে অসুবিধে হবে না।
প্রবােধ বললে—সব ত বুঝলুম, কিন্তু আমাকে নিয়ে যেতে চাও কেন? মাষ্টার সঙ্গে থাকলে তােমাদের ফুর্তির ব্যাঘাত হবে না?
সজোরে মাথা নেড়ে সুধীর বললে,—মােটেই একদম একটুও ব্যাঘাত হবে , আপনি সে রকম মানুষই নন সার। আপনি সঙ্গে থাকলে আমাদের তিন ডবল ফুর্তি হবে। নিমাই নরেন সুরেন সমস্বরে বললে, “নিশ্চয় নিশ্চয়। প্রবােধ যেতে রাজী হলাে।
দেওঘর আর জসিডির মাঝমাঝি গণেশমুণ্ডা পল্লীটি সম্প্রতি গড়ে উঠেছে। বিস্তর সুদৃশ্য বাড়ি, পরিচ্ছন্ন রাস্তা, প্রাকৃতিক দৃশ্যও ভালাে। ভৈরববাবুর অট্টালিকা ভৈরব কুটির আর তার প্রকাণ্ড বাগান দেখে ছেলেরা আনন্দে উৎফুল্ল হলাে এবং ঘুরে ঘুরে চারিদিকে দেখতে লাগলাে। বাগানে অনেক রকম ফলের গাছ। গােটা কতক আতা গাছে বড়াে বড়াে ফল ধরেছে, অনেকগুলাে একেবারে তৈরি, পেড়ে খেলেই হয়।
প্ৰবােধ বললে,—ভারী আশ্চর্য তাে, ভৈরববাবুর দারােয়ান আর মালী দেখছি অতি সাধুপুরুষ।
সুধীর বললে,—মনেও ভাববেন না তা, আমি এখানে এসেই সব খবর নিয়েছি সার। দারােয়ান মেহী পাড়ে আর মালী ছেদী মাহাতাে এদের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া। দু'জনে দু'জনের ওপর কড়া নজর রাখে তাই এ পর্যন্ত কেউ চুরি করবার সুবিধে পায়নি। | নিমাই বললে—যদি দু-তিন সের দুধ যােগাড় করা যায় তবে চমৎকার আতার। পায়েস হতে পারবে। আমি তৈরি করা দেখেছি, খুব সহজ।
সুধীর বললে—বেশ তাে, তুই তৈরি করে দিস। ও পাঁড়েজী, তুমি কাল সকালে তিন সের খাটি দুধ আনতে পারবে?
পাড়ে বললে, জরুর পিরবাে হুজুর। নাওয়া-খাওয়া আর বিশ্রাম চুকে গেল। বিকেল বেলা সকলে বেড়াতে বেরুলাে। ঘণ্টা খানেক বেড়াবার পর ফেরার পথে সুধীর বললে, দেখুন সার, এই বাড়িটি কী সুন্দর, ভীমসেন ভিলা! গেটের ওপর কী চমৎকার থােকা থােকা হলদে ফুল ফুটেছে!
আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে পিন্টু চেঁচিয়ে উঠলাে—ওই, ওই, ওই একটা নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে গেল।
নিমাই বললাে, এদিকে দেখুন সার, উঃ কী ভয়ানক পেয়ারা ফলেছে, কাশীর পেয়ারার চাইতে বড়াে বড়াে! নিশ্চয় এ বাড়িরও দারােয়ান আর মালীর মধ্যে ঝগড়া আছে, তাই চুরি যায়নি।
ফটকে তালা নেই। সুধীর ভিতরে ঢুকে এদিক-ওদিক উঁকি মেরে বললে, কাকেও কোথাও দেখছি না, কিন্তু ঘরের জানালা খােলা, মশারি টাঙানাে রয়েছে। বােধহয় সবাই বেড়াতে গেছে। দারােয়ান, ও দারােয়ানজী, ও মালী?
কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। তখন সকলে ভিতরে এসে ফটকের পাল্লা ভেজিয়ে দিলে। নিমাই বললে, একটা পেয়ারা পাড়বাে সার?
প্রবােধ বললে, বাজারে প্রচুর পেয়ারা দেখেছি, নিশ্চয়ই খুব সস্তা, খেতে চাও তাে কিনে খেয়াে। বিনা অনুমতিতে পরের দ্রব্য নিলে চুরি করা হয় তা জানাে না?
—জানি সার। চুরি করবাে না, শুধু একটা চেখে দেখবাে কাশীর পেয়ারার চাইতে ভালাে কি মন্দ।
প্রবােধ পিছন ফিরে গম্ভীরভাবে একটা তালগাছের মাথা নিরীক্ষণ করতে লাগলাে। মৌন সম্মতি লক্ষণ ধরে নিয়ে নিমাই গাছে উঠলাে। একটা পেয়ারা পেড়ে কামড় দিয়ে বললে, “বােম্বাই আমের চাইতে মিষ্টি!
সুধীর বললে,—এই নিমে, সারকে একটা দে।। নিমাই একটা বড়াে পেয়ারা নিয়ে হাত বুলিয়ে বললে,—এইটে ধরুন সার, একটু চেখে দেখুন কী চমৎকার!
পেয়ারায় কামড় দিয়ে প্রবােধ বললে, সত্যিই খুব ভালাে পেয়ারা। আর বেশি পেড়াে না, তা হলে ভারী অন্যায় হবে কিন্তু। লােভ সংবরণ করতে শেখাে।
ততক্ষণ নিমাইয়ের সব পকেট বােঝাই হয়ে গেছে। তার সঙ্গীরাও প্রত্যেকে দু-তিনটে করে পেয়েছে। সুধীর বললে,—এই নিমে, শুনতে পাচ্ছিস না বুঝি?
সার রাগ করছেন, নেমে আয় চট করে, এক্ষুণি হয়ত কেউ এসে পড়বে। | হঠাৎ কঁাচ করে গেটটা খুলে গেল, একজন মােটা বৃদ্ধ ভদ্রলােক আর একটি রােগা বৃদ্ধা মহিলা প্রবেশ করলেন। দু'জনের হাতে একটি গামছায় বাঁধা বড়াে বড়াে দুটি পোঁটলা। নিমাই গাছের ডাল ধরে ঝুলে ধুপ করে নেমে পড়লাে।
বৃদ্ধ চেচিয়ে বললেন, “আঁ, এসব কী, দল বেঁধে আমার বাড়ি ডাকাতি করতে এসেছাে? ভদ্রলােকের ছেলের এই কাজ? ঝন্ধু সিং, এই ঝন্তু সিং। বেটা গেল কোথায় ? | পোটলা দুটি নিয়ে মহিলা বাড়ির মধ্যে ঢুকলেন। ঝন্ধু সিং এক লােটা বৈকালিক ভাং খেয়ে তার ঘরে ঘুমচ্ছিল, এখন মনিবের চিৎকারে উঠে পড়ে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বেরিয়ে এলাে। সে হুঁশিয়ার লােক, গেটে তাড়াতাড়ি তালা বন্ধ করে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে বললে, হুজুর হুকুম দেন তাে গানে মে খবর দিয়ে আসি। হে বৈজনাথজী, ছিয়া ছিয়া, ভদ্দর আদমীর ছেলিয়ার। এহি কাম! | হুজুর বলিলেন,-খুব হয়েছে, ডাকাতরা চোখে সামনে সব লুটে নিলে আর তুমি বেহুঁশ হয়ে ঘুমুচ্ছিলে!
তারপর, মশায়দের কোথেকে আগমন হলাে। এরা তাে দেখছি ছােকরা, বজ্রজাতি করবারই বয়স; কিন্তু তুমি বুঝি দলের সদ্দার ?
প্রবােধ হাতজোড় করে বললে, “মহা অপরাধ হয়ে গেছে সার। এই নিমাই, সব পেয়ারা দারওয়ানজীর জিম্মা করে দাও। আমরা বেশি খাইনি সার, মাত্র দু-তিনটে চেখে দেখেছি। অতি উৎকৃষ্ট পেয়ারা।
—আজ্ঞে, আমার নাম প্রবােধ চন্দ্র ভট্টাচার্য, মানিকতলার রামগােপাল হাইস্কুলের মাষ্টার। এরা সব আমার ছাত্র।
পূজোর ছুটিতে আমার সঙ্গে বেড়াতে এসেছে।
—খাসা অভিভাবকটি পেয়েছে, খুব নীতিশিক্ষা হচ্ছে! আমাকে চেনাে? ভীমচন্দ্র সেন, রিটায়ার্ড ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। রায়বাহাদুর খেতাবও আছে। কিন্তু এই স্বাধীন ভারতে সেটার কদর নেই। বিস্তর চোরকে আমি জেলে পাঠিয়েছি। তােমার স্কুলের সেক্রেটারিকে যদি লিখি—আপনাদের প্রবােধ মাষ্টার এখানে এসে তার ছাত্রদের চুরিবিদ্যে শেখাচ্ছে, তা হলে কেমন হয় ?
—যদি কর্তব্য মনে করেন তবে আপনি তাই লিখুন সার, আমি আমার কৃতকর্মের ফল ভােগ করবাে। তবে একটা কথা নিবেদন করছি কেউ অভাবে পড়ে চুরি করে, কেউ বিলাসিতার লােভে করে, কেউ বড়ােলােক হবার জন্যে করে। কিন্তু কেউ কেউ, বিশেষত যাদের বয়স কম, নিছক ফুর্তির জন্যেই করে। আমি অবশ্য ছেলেমানুষ নই, কিন্তু এই ছেলেদের সঙ্গে মিশে, এই শরৎ ঋতুর প্রভাবে, আর আপনার এই সুন্দর বাগানটির শােভায় মুগ্ধ হয়ে আমারও একটু বালকত্ব এসে পড়েছে। এই যে পেয়ারা চুরি দেখছেন, এ ঠিক মামুলি কুকর্ম নয়, এ হচ্ছে শুধু নবীন প্রাণরসের একটু উচ্ছলতা।
—“। ওরে নবীন ওরে আমার কাঁচা, পুচ্ছটি তাের উচ্চে তুলে নাচা। রবি ঠাকুর তােমাদের মাথা খেয়েছেন।...
—সার, যে কুকর্ম করে ফেলেছি তার বিচার একটু উদার ভাবে করুন।
আপনি ধীর স্থির প্রবীণ বিচক্ষণ ব্যক্তি, ছেলেমানুষী ফুর্তি বহু ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন
—কে বললে, ঊর্ধ্বে উঠে গেছি? আমাকে জরব গিধড় ঠাউরেছাে নাকি?
—তাহলে আশা করতে পারি কি যে আমাদের ক্ষমা করলেন? আমরা যেতে পারি কি?
—পেয়ারাগুলাে নিয়ে যাও, চোরাই মাল আমি স্পর্শ করি না। আচ্ছা, এখন ) যেতে পারাে, এবারকার মতন মাপ করা গেল।
এমন সময় মহিলাটি বাইরে এসে বললেন,কী বেআকেল মানুষ তুমি, এরা তােমার এজলাসে আসামী নাকি? তুমি এদের মাপ করবার কে? তােমাকে মাপ করবে কে শুনি? এখন যেয়াে না বাবারা, এই বারান্দায় এসে একটু বসাে।
ভীমবাবু বললেন,—এদের খাওয়াবে নাকি? তােমার ভাঁড়ার তাে টু টু, চা পর্যন্ত ফরিয়ে গেছে, হরি সরকার বাজার থেকে ফিরলে তবে হাঁড়ি চড়বে।
—সে তােমাকে ভাবতে হবে না, যা আছে তাই দেবাে। মিনিট দশ সবুর করতে হবে বাবারা।
গৃহিণী ভিতরে গেলে ভীমবাবু বললেন,—উনি ভীষণ চটে গেছেন, না খাইয়ে ছাড়বেন না। অগত্যা ততক্ষণ এই এজলাসেই তােমরা আটক থাকো। এখানে উঠেছাে কোথায়?
প্রবােধ বললে,—ভৈরব কুটিরে, স্টেশনের দিকে যে রাস্তা গেছে তারই ওপর।
ভীমবাবু বললেন, কী সর্বনাশ! যার ফটকের পাশে বেগুনী বুগনভিলয়া' ঝাড় আছে সেই বাড়ি?
—আজ্ঞে হ্য। বাড়িটার কোনাে দোষ আছে?
নাঃ দোষ তেমন কিছু নেই। তােমরা ওখানে উঠেছে তা ভাবিনি।
... একটু পরে ভীমবাবুর পত্নী একটা বড়াে ট্রেতে বসিয়ে একটি ধুমায়মান গামলা এবং গােটাকতক বাটি আর চামচ নিয়ে এলেন। ভীমবাবু একটা টেবিল এগিয়ে দিয়ে বললেন,—এ কী এনেছে, আতার পায়েস যে! এর মধ্যেই তৈরি করে ফেললে?
গৃহিণী বললেন,—আর তাে কিছু নেই, এই দিয়েই ছেলেরা একটু মিষ্টিমুখ
ভীমবাবু বললেন,—সবটাই এনেছাে নাকি?
—হ্যা গাে হা, তুমি আর লােভ করাে না বাপু। ছেলেরা যে পেয়ারা পেড়েছে তাই না হয় একটু খেয়াে। চিবুতে না পারাে তা সেদ্ধ করে দেবাে।
সুধীর সহাস্যে বললে, সার, আমাদের ওখানে বিস্তর আতা ফলেছে, ইয়া বড়াে বড়াে। কাল সকালে পায়েস বানিয়ে আপনাদের দিয়ে যাবাে।
ভীমবাবু বললেন,না-না এমন কাজটি করাে না। আতা আমার সয় না।
ভৈরব কুটিরে ফিরে এসে নিমাই বললে,—এ কী! গাছের বড়াে বড়াে আতাগুলাে গেল কোথায় ?
সুধীর বললে—বােধহয় পাঁড়েজী সদ্দারী করে পেড়ে রেখেছে। ও পাড়ে, আতা কী হলাে?
পাড়ে ব্যস্ত হয়ে সে মাথায় একটু চাপড় মেরে করুণ কণ্ঠে বললে, কী কহবাে হুজুর, বহুত ঝামেলা হয়ে গেছে। এক মােটা-সা বাবু আর এক দুবলাসা বুঢ়ী মাঈ এসেছিল। বাবু পটপট সব আতা ছিড়ে লিলে। আমি মানা করলে খাফা হয়ে বললে, চোপ হরাে উল্লু। আমার ডর লাগলাে, শায়দ কোই বড়া অপসর উপসরকা বাবা-উবা হােবে— সুধীর বললে—হাতে লাল গামছা ছিল?
—জী হাঁ, উসি তে তাে বাঁধ কে লিয়ে গেল। হাসির প্রকোপ একটু কমলে প্রবােধ বললে,—যাক আমরা ঠকিনি, আতার পায়েস খেয়েছি, পেয়ারাও পেয়েছি। কিন্তু ভীমচন্দ্র সেন মশাইয়ের জন্য দুঃখ হচ্ছে, তার গিন্নী তাকে বঞ্চিত করেছেন।
নিমাই বললে,—ভাববেন না সার, দিন দুই পরেই আবার বিস্তর আতা পাকবে, তখন পায়েস করে ভীমসেন মশায় আর তার গিন্নীকে খাওয়াবাে।
এ ধরণের আরো মজার মজার গল্প পড়তে ক্লিক করুন Educational Blogs এবং Subscribe করে পাশেই থাকবেন।

0 মন্তব্যসমূহ