ভুড়ির বিপত্তি
আমি তখন দেওঘরে এক বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতা করি। শীত প্রায় আসবাে আসবাে করছে। সকাল সন্ধ্যে হাওয়ায় একটু ঠাণ্ডায়
কামড়। শিক্ষক ছাত্র এখানকার নিয়ম অনুসারে সকলেই সকলকে দাদা সম্বােধন করে থাকেন। রবিবার। দুপুরে বেশ ভুরিভােজ হয়েছে। এইবার একটু গড়াগড়ি দিতে পারলেই হয়। এমন সময় টাঙ্গা রােদ ঝলমলে মাঠ পেরিয়ে আমাদের শিক্ষকাবাসের সামনে এসে দাঁড়াল। সঙ্গীত শিক্ষক তুলসীদা লম্বা ছিপছিপে গৌরবর্ণ মানুষ একেবারে ধােপদুরস্ত হয়ে এসে আমাদের ঘাড় ধরেই প্রায় বিছানা থেকে তুলে দিলেন। আজ ত্রিকূট, দর্শন করতেই হবে।
তুলসীদার কৃপায় আজ আমরা ত্রিকুট যাত্রী। সঙ্গে অঙ্কের টিচার বিদ্যুৎদা আর ইংরেজী শিক্ষক সুধাংশুদা সমবয়সী। আমাদের দুজনের চেয়ে বয়সে বড়। তুলসীদার গলায় মাফলার। গাইয়েদের গলার অদৃশ্য শত্রু অনেক। বারাে-মাসেই মাফলার দিয়ে প্যাক করে রাখতে হয়। নাদ ব্রহ্ম। তিনি নাভির কাছ থেকে 'বায়ু পিত্ত কফ ভেদ করে উঠে আসেন কণ্ঠে। তুলসীদার ডেলি ডায়েটে স্টার্চ কম, প্রােটিন বেশী, এক কেজি বিদ্যাপীঠের বাগানের পেঁপে, দুটো মাঝারি সাইজের পেয়ারা আর সকালে আধ হাত নিমাতন কম্পালসারি। চেহারাটি একেবারে কঞ্চিকা মাফিক। বিদ্যুৎদা বারবেল সাধেন। বাইসেপ, ট্রাইসেপ,ডেলটয়েড় সবই বেশ খেলে। খেলে না কেবল কোলােন। ইসবগুল দুকেজি পালঙের সুরুষ সবই ফেল করেছে। মাংসের যসটি খান মাংস ফেলে দিন এই তার উপদেশ। দুশ্চিন্তা একটাই চুলে সাদা ছিট ধরছে আর উঠে যাচ্ছে। অন্যথায় স্বাস্থ্যবান, সুপুরুষ। সুধাংশুদার সমস্যা একটাই। ভুড়িটা আর কত বাড়তে পারে। তিনি দেখতে চান। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে প্রকৃতই উদার। বিদুৎদার মতে এই উদারতা সব উদরে গিয়ে জমেছে। সুধাংশুদার মস্তবড় গুণ ধীর স্থির মেজাজটি অদ্ভুত ঠাণ্ডা এবং বেশীক্ষণ তিনি জেগে থাকতে পারেন না। এইতাে কোলের উপর ভূড়িটি নিয়ে আয়েস করে বসে আছেন। আমাদের রসিকতা তার শরীরের চর্বির স্তর ভেদ করতেই পারে না তুলসীদা। নাকি ৬৫ সালে একটা গণ্ডারকে সুড়সুড়ি দিয়েছিলেন, রিপাের্ট সেটা ৬৭ সালে হেসে উঠেছিল।
তিনটে নাগাদ আমরা ত্রিকুটের পাদদেশে। তুলসীদার ফ্লাস্কের চা এক চুমুক করে হল। সুধাংশুদা ঘাড় বেঁকিয়ে পাহাড়ের মাথাটা একবার দেখবার চেষ্টা করে বললেন—ইমপসিবল, ওনলি এ গােট ক্যান ক্লাইম্ব দিস হিল। তুলসীদা বললেন—রাখুন মশাই আপনার ইঞ্জিরি। ভাষাটা জানি না বলে যা খুশি তাই গালাগালি দেবেন। বিদ্যুৎদা বললেন, বিদ্যাপীঠের ডাক্তারবাবু কি বলেছেন মনে নেই? পূর্ণ কুম্ভের মত আপনি এখন পূর্ণগর্ভ। আরােহন এবং অবরােহন আপনার একমাত্র ওষুধ। ওসব চালাকি চলবে না। চলুন।
সুধাংশুদার প্রতিবাদ, কাকুতি মিনতি, কে শুনবে। পর্বতশীর্যে সুধাংশুদাকে আমরা ভােলানাথের মত প্রতিষ্ঠিত করবই। প্রতিজ্ঞা ইজ প্রতিজ্ঞা।
| ত্রিকুট খুব সহজ পাহাড় নয়। উঠতে গিয়েই মালুম হল। কাকরে পা শ্লিপ করে। আঁকড়ে ধরার মত কিছুই নেই। একমাত্র নিজের প্রাণটি ছাড়া! পাশেই খাদ। পড়লে চিরশান্তি। পাহাডেই প্রেতাত্মা হয়ে আটকে থাকতে হবে। ভ্যানগার্ড তুলসীদা, রিয়ার গার্ড বিদ্যুৎদা। মাঝে আমি আর সুধাংশুদা। সুধাংশুদা বললেন, এই প্রথম বুঝলুম ভুড়ির ওজন কত। বেশ ভারি মশায়। আগে ভাবতুম মাস উইদাউট ওয়েট এখন দেখছি উইথ ওয়েট।
একটা চাতাল মত জায়গা পাওয়া গেল, একটু বসে, বাকি চাটা শেষ করতে হয়। একটু প্রকৃতি দর্শন না করলে পর্বতপ্রেম আসে কি করে। সুধাংশুদা বললেন, ‘ভাই আমার উপর আর টর্চার করাে না। তােমরা আমার ছেলের মত। আমি এখানে বসি। তােমরা নামার সময় আমাকে নিয়ে যেও। একটা রফা হল। আর একটু উঠলেই রাবণ গুহা দর্শন করে আমরা নেমে যাবাে। আরে মশাই শরীর আগে না মাইথােলজি আগে। রাবণের রেলিকস না দেখে চলে যাবেন? তুলসীদার অনুপ্রেরণায় হাতের উপর ভর দিয়ে সুধাংশুদা শরীরকে ওঠালেন।
গুহা দেখলেই ভয় ভয় করে। গুহার অন্তর্নিহিত সত্য সহজে জানা যায় । কি যে মাল মসলা ঘাপটি মেরে ভেতরে বসে আছে। একমাত্র ঋষিরাই বলতে পারেন। মুখটা বিশাল। দুদিকে পাথরের দেয়াল। একটু যেন টেপারিং হয়ে গেছে। আমাদের কনভয়ের সেই আগের অর্ডার। প্রথমে তুলসীদা, পাথ ফাইণ্ডার, হাতে টর্চ। নেক্সটু সুধাংশুদা। তারপর আমি। তারপর বিদ্যুৎদা। তুলসীদা বললেন, ব্যাঘ্র যদি থাকে আগে আমাকে খাবে। সুধাংশুদা বললেন, আই এ্যাম নট শিওর। খাদ্যের ব্যাপারে ওরা ভীষণ সিলেকটিভ। বােনস ওরা চিবােয় ঠিকই তবে সেটাই আগে চায়। কথা বলতে বলতে বেশ কিছুটা ঢুকে গেছি। এইবার সেই জায়গাটা দুই পাথরের দেওয়াল চেপে এসেছে, তুলসীদা কাত হয়ে এগিয়ে গেলেন। সুধাংশুদা তাই করলেন। কেবল একটু মিস্ ক্যালকুলেসন। একি হল? সুধাংশুদার গলা। আর তাে যাচ্ছে না। আমরা এপাশের দুজন সমস্যাটা বুঝতেই পারিনি। সুধাংশুদা বললেন, আমি যাচ্ছি না, দাঁড়িয়ে থাকলে যাবেন কি করে? চলার চেষ্টা করুন। সুধাংশুদা বললেন প্রায় কাদো কাঁদো, ভূঁড়িটা আটকে গেছে ভাইসের মত। আমরা চিৎকার করলুম তুলসীদা। দূর থেকে উত্তর এল। সুধাংশুদার ভুড়ি আটকে গেছে।
শেওলা ধরা দেওয়াল। ভুড়ি তার গেঞ্জি আর আদ্দির পাঞ্জাবির কভার নিয়ে দুটো পাথরের মাঝখানে জম্পেশ। প্রথমে কিছুক্ষণ কমনসেনসের খেলা চললনিঃশাস খালি করে পেট কমান। দেখা গেল এ পেট সে পেট নয়। নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাড়া কমার কোনাে সম্পর্কই নেই। সন্ধ্যের মুখে আবার উদরের বায়ু সঞ্চার হয়। আপনার নিজের পেট নিজের কন্ট্রোল নেই। একটু নামাতে পারছেন
। তুলসীদা সুধাংশুদার অক্ষমতায় খুব অসন্তুষ্ট। কি করি বলুন কমছে না যে। সুধাংশুদা হােপলেস। বিদ্যুৎ তােমরা ওদিক থেটে টেনে টুনে দেখাে। আমিও এদিক থেকে ঠেলে দেখি। আউর থােরা হেঁইও, বয়লট ফাটে হেঁইও। এক ইঞ্চিও নড়ানাে গেল না। মােম আটকেছেন—মশাই। কি করে আটকালেন। একেবারে নিরেট থাম। আপনি কি রাবণের চেয়ে দশাসই। অতবড় একটা রাক্ষস স্যাট স্যাট গলে যেত। আর আপনি সামান্য একজন মানুষ আটকে গেলেন। | রাবণের ফিজিওনমি নিয়ে কিছুক্ষণ গবেষণা হল। সুধাংশুবাবু বললেন, তার মশাই নানা রকম মায়া জানা ছিল। এইখানটায় এলে হয়তাে মাছি হয়ে যেতে। বিদ্যুৎদা বললেন খুব মশাই। তবু নিজের দোষ স্বীকার করবেন না। ব্যায়াম, ব্যায়াম। রাবণ মুগুর ভাঁজতেন, পাঁচ হাজার জন, দশা হাজার বৈঠক ডেলি। আর রাক্ষস হলেও রাক্ষুসে খাওয়া ছিল না আপনার মত। কোনাে ছবিতে রাবণের ভুড়ি দেখেছেন। অন্য সময় হলে তর্কাতর্কি হত। বিপন্ন সুধাংশু, রাবণের উপর লেটেষ্ট রিসার্চ অম্লান বদলে মেনে নিলেন। আচ্ছা এখন তাহলে কাতুকুতু দিয়ে দেখা যাক। নিন হাত তুলুন। প্রথমে বিদ্যুৎদা। কোথায় কি? খ্যাত খ্যাত করে হেসে উঠলে ভুড়িটা হয়তাে ধরফড় করে উঠতাে। সেই সময় মােক্ষম ঠ্যালা। আমি বললুম দাঁড়ান, ওভাবে ডিরেক্ট কাতুকুতুতে হবে না। টেকনিক আছে। দেখি হাতের তালুটা। এই নিন, ভাত দি, ডাল দি, তরকারী দি, মাছ দি, নিন মুঠো করুন, মুঠো খুলুন, যাঃ কে খেয়ে গেল আঁ, ধর মিনিকে, ধর মিনিকে, কুত কুতু। কোথায় হাসি? না মশাই হবে না। আপনি এখানেই থাকুন ফসিল হয়ে। অপঘাতে মৃত্যু লেখা আছে, কে খণ্ডাবে।
তুলসীদা বললেন, আহা আমি কি শুনাব, সতী সাধ্বী স্ত্রী যে সহমরণে যাবে? এই মালকে ক্লিয়ার না করলে এদিকে তাে ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেছে। আপনি হামাগুড়ি দিয়ে চলে আসুন। কাপড়ে শ্যাওলা লেগে যাবে যে? বিদ্যুৎদা বললেন, জীবন আগে না কাপড় আগে। তুলসীদা অবশেষে হামা দিয়ে চলে এলেন আমদের দিকে। বসার চেষ্টা করে দেখুনতাে। সুধাংশুদাকে যা বলা হচ্ছে, প্রাণের দায়ে তাই তিনি বাধ্য ছেলের মত করছেন। বসার চেষ্টা করলেন, হল না। আমরা বললাম, একটু জলত্যাক করুন তাে যদি পেটটা কমে। না, মরে গেলেও তিনি এই কাজটি করতে রাজি হলেন না। এদিকে সন্ধ্যে হয়ে আসছে। তুলসীদা বললেন, টাঙ্গাওয়ালা চলে গেলে ফেরার দফা রফা। টর্চ জ্বেলে তুলসীদা একবার ভূঁড়িটা ইনসপোন করে বললেন, বিদ্যুৎ এদিকে এস। ছুরি আছে? আমার পকেটে ছুরি ছিল। | ছুরি কি হবে তুলসী দা! সুধাংশুদা প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কি। ওপাশ থেকে একপােচ কেটে নেবাে। সবটাই তাে চর্বি, লাগবে না। আপনার যা গ্রোথ, দেখতে দেখতেই গজিয়ে যাবে। তুলসীদা ছুরি দিয়ে পাশ থেকে গেঞ্জি আর পাঞ্জাবীটা ফালা করে ভুড়িটাকে খুলে দিলেন। ঠাণ্ডা লেগেছে। সুধাংশুদা একটু সিটিয়ে গেলেন। কাজ হয়েছে। তুলসীদা ফ্লাস্ক থেকে খানিকটা চা ঢাললেন, জয় বাবা বদ্রি বিশালা। একটু লুব্রিকেট করে দিলুম। এবার মারাে টান। আমরা চারজনেই জড়াজড়ি করে পড়লাম। সুধাংশুদার ভুড়ির ওপরে নুনছলে একটু উঠে গেছে। পাঞ্জাবীটা ছিড়ে বেরিয়ে গেছে। ভুড়িটা সম্পূর্ণ অনাবৃত। চা আর শ্যাওলার পােষ্ট মাখানাে। বৃদ্ধ বয়সে গায়ে হলুদ। | টাঙ্গা যখন বিদ্যাপীঠে প্রবেশ করল, রাত হয়ে গেছে। নামার আগে পুনর্জীবনপ্রাপ্ত সুধাংশুদার একটিই খালি কাতর মিনতি—“ভাই দয়া করে ছাত্রদের বলাে না। বৃদ্ধ বয়সে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে হবে।' তবু এমন ঘটনা চেষ্টা করলেও চেপে রাখা যায় না। রাষ্ট্র হয়ে পড়বেই।

0 মন্তব্যসমূহ