পাগলা গণেশ
মাধ্যাকর্ষণ প্রতিরােধকারী মলম অবিষ্কার হওয়ার পর থেকে পৃথিবীতে নানারকম উড়ান যন্ত্র আবিষ্কারের একটা খুব হিড়িক পড়ে গেছে।
কেউ ডাইনীদের বাহন ডাণ্ডাওলা ঝাটার মতাে, কেউ নারদের টেকির মতাে, কেউ কার্পেটের মতাে, কেউ কার্তিকের বাহন ময়ূরের মতাে উড়ান যন্ত্র আবিষ্কার করে তাতে চড়ে বিষয়কর্মে যাতায়াত করছে। আকাশে, তাই সব সময়েই নানারকম জিনিস উড়তে দেখা যায়। এমন কি কৃত্রিম পাখনাওলা মানুষকেও
সালটা ৩৫৮৯। ইতিমধ্যে চাদ, মঙ্গল এবং শুক্রগ্রহে মানুষ ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে, সূর্যের আরও দুটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং জানা গেছে আর কোনও গ্রহ নেই, মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে হাজার হাজার মানুষ আলাের চেয়েও গতিলেগসম্পন্ন মহাকাশ যানে রওনা হয়ে গেছে এক দেড়শাে বছর আগে থেকে এবং এখনও অনেকে যাচ্ছে। কাছেপিটে মারা গেছে তাদের ফেরার সময় হয়ে। 'এল। তবে সেটা এক মিনিট পর না একশাে বছর পর তা জানবার উপায় নেই। তা বলে পৃথিবীর মানমেরা হাল ছাড়েনি। সেই এক দেড়শাে বছর আগে যারা জন্মেছিল তারা সকলেই সশরীরে বর্তমান। আজকাল পৃথিবীতে মানুষ মরে না। যারা মহাকাশে গেছে তারা ফিরে এসে সেই আমলের লোকেদের দেখতে পাবে।
তবে সব মানুষই বেঁচে আছে বলে নতুন মানুষের জন্মও আর হচ্ছে না। গত দেড়শাে বছরের মধ্যে কেউ পৃথিবীতে শিশুর কান্না শােনেনি।
এদিকে ঘরে ঘরে মানুষ এত বেশি বিজ্ঞান নিয়ে বুদ হয়ে আছে যে, প্রতি ঘরের প্রত্যেকেই ফোনও না কোনও বিজ্ঞানের বিজ্ঞানী। | বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনও চর্চাই নেই। কবিতা, গান, ছবি আঁকা, কথা-সাহিত্য, নাটক, সিনেমা এসব নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায় না। ওসব অনাবশ্যক ভাবাবেগ কোনও কাজেই লাগে না। খামােখা সময় নষ্ট।
খেলাধুলাের পাটও চুকে গেছে। অলিম্পিক উঠে গেছে। বিশ্বকাপ বিলুপ্ত। আছে শুধু বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান। পূর্ণিমার চাঁদ দেখলে, কোকিলের ডাক শুনলে বা পলাশ ফুল ফুটলে কেউ আর আহা উহু করে না। বর্ষাকালের বৃষ্টি দেখলে কারও মন আর মেদুর হয় না। ওগুলােকে প্রাকৃতিক কার্যকারণ হিসেবেই দেখা
গােলাপ ফুলের সৌন্দর্যের চেয়ে তার অ্যানালাইসিসটাই বেশি জরুরী। দয়া মায়া করুণা ভালবাসা ইত্যাদিরও প্রয়ােজন না থাকায় এবং চর্চার অভাবে মানুষের মনে আর ওসবের উদ্রেক হয় না।
ব্যতিক্রম অবশ্য এক আধজন আছে। যেমন পাগলা গণেশ। পাগলা গণেশের বয়স দুশাে বছর।
পঞ্চাশ বছর বয়সে, অর্থাৎ আজ থেকে দেড়শাে বছর আগে মৃত্যুঞ্জয় টনিক আবিষ্কার হয়। গণেশও আর সকলের মতাে টনিকটা খেয়েছিল ফলে তার মৃত্যু বন্ধ হয়ে গেল। দেড়শাে বছর আগে যখন সুকুমার শিল্পবিরােধী আন্দোলন শুরু হল এবং শিল্প সঙ্গীত সাহিত্য ইত্যাদির পাট উঠে যেতে লাগল তখন গণেশের ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি। তাছাড়া বিজ্ঞানের বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকা দরকার বলে তার মনে হল। গণেশ অনেক চেষ্টা করে যখন দেখল কালের চাকার গতি উল্টোদিকে ফেরানাে যাবে না তখন সে সভ্য সমাজ থেকে দূরে। থাকার জন্য হিমালয়ের একটি গিরিগুহায় আশ্রয় নিল।
তা কল হিমালয় (যে খুব নির্জন জাগা তা নয়। এভারেস্টের চূড়া চেঁছে অবজার্ভেটরি হয়েছে, রূপকুণ্ডে বায়ােকেমিষ্টির ল্যাবরেটারি, কে টু, কাঞ্চনজঙঘা, যমুনােত্রী গঙ্গোত্রী, মানস সরােবর সর্বত্রই নানা ধরনের গবেষণাগার। সমুদ্রের তলাতেও চলছে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অর্থাৎ ভূগর্ভে, ভূপৃষ্ঠে এ<3 তরীক্ষে কোথাও নিপাট নির্জাতা নেই। পৃথিবীর জনসংখ্যা যে খুব বেশি তা নয়। কিন্তু তারা সমস্ত পৃথিবীতে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে, নির্জনতা খুজে পাওয়া খুব কঠিন কাজ।
এই তাে আজ সকাল থেকে গণেশ বসে কবিতা লিখছে। একটু আগে একটা টেকা আর একটা ভেলায় চড়ে দুটো লােক এসে বলল, এই যে গণেশবাবু, কী করছেন?
কবিতা লিখছি। কবিতা? হােঃ হােঃ হােঃ হােঃ। তা আপনার কবিতা শুনছেই বা কে আর পড়ছেই বা কে?
আকাশ শুনছে, বাতাস শুনছে, প্রকৃতি শুনছে। কবিতার পাতা বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছি। যদি কেউ কুড়িয়ে পায় আর পড়তে ইচ্ছে হয় তাে পড়বে। | হােঃ হােঃ হােঃ হােঃ।
কদিন আগে সন্ধেবেলা গণেশ একদিন গলা ছেড়ে গান গাইছিল। তার গানের গলা বেশ ভালই। | হঠাৎ দুটো পাখাওলা লােক লাসা থেকে ইসলামাবাদ যেতে যেতে নেমে এসে রীতিমতাে ধমক দিয়ে বলল, ও মশাই, অমন বিকট শব্দ করছেন কেন?
শব্দ কী। এ যে গান।। গান। ওকেই কি গান বলে নাকি। ধুর মশাই, এ যে বিটকেল শব্দ।
একদিন পাহাড়ের গায়ে যান্ত্রিক বাটালি দিয়ে পাথর কেটে ছবি আঁকছিল গণেশ। হঠাৎ একটা ধামা নেমে এল। এক মহিলা খুব আগ্রহের সঙ্গে বলে চলেন, এটা কিসের সার্কিট ডিজাইন বলুন তাে। বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। ডিজাইন নয়, ছবি। খেয়ালখুশির ছবি।
ভদ্রমহিলা চোখের পলক না ফেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই। ছবি হচ্ছে। স্থ।
গণেশ জানে, একা সে পৃথিবীর গতি কিছুতেই উল্টে দিতে পারবে না। কিন্তু একা বসে বসে যে নিজের মতাে কিছু করবে তারও উপায় নেই। এই মৃত্বহীন
জীবন, এই তন্তেহীন আয়ু কি এভাবেই যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হবে? সুইসাইড * কৱে কোনও লাভ নেই। আজকাল মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তােলা শক্ত কাজ
তা নয়ই, বরং পৃথিবীর জনসংখ্যার ভারসাম্য রাখতে তা করা আবশ্যিক। | গণেশের তিন ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলের বয়স একশাে চুয়াত্তর বছর, মেঙোর একশাে একাত্তর, ছােট ছেলের একশাে আটষট্টি এবং মেয়ের বয়স একশাে ছেষট্টি। প্রত্যেকেই কৃতী বিজ্ঞানী। তারা অবশ্য বাপের কাছে আসে না। অন্তত গত একশাে বছরের মধ্যে নয়। গণেশ তাদের মুখশ্রী ভুলে গেছে। গণেশের স্ত্রী ক্যালিফোর্নিয়া মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করতেন, দেড়শাে বছর আগে তিনি অ্যাঞেমিডা নক্ষত্রপুঞ্জে রওনা হয়ে যান। এখনও ফেরেননি।
আজ সকালে গণেশকে কবিতায় পেয়েছে। কবিতা লিখছে আর ভাসিয়ে দিচ্ছে বাতাসে। কবিতার কাগজগুলাে বাতাসে কাটা ঘুড়ির মতাে লাট খাচ্ছে, ঘুরছে ফিরছে, ভাসছে, পাক খাচ্ছে, তারপর পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে অনেক দূর। প্রতিদিন যত কবিতা লিখেছে গণেশ সবই এইভাবে ভাসিয়ে দিয়েছে। যদি কারও কাজে পৌছােয়, যদি কেউ পড়ে।
(A
আকাশে একটা পিপে ভাসছিল। গণেশ লক্ষ্য করেনি। পিপেটা ধীরে ধীরে নেমে এল। নামল এক ন পুলিশম্যান। গণেশকে সসম্ভ্রমে অভিবাদন করে বলল, স্যার, এককালে আপনি যখন কলকাতার সায়েন্স কলেজে মাইক্রো ইলেকট্রনিকস পড়াতেন তখন আমি আপনার ছাত্র ছিলাম। কিন্তু এসব আপনি কী করছেন? পাহাড়ময় কাগজ ছড়াচ্ছেন কেন? এটা কি নতুন ধরনের কোনও গবেষণা?
গণেশ মাথা নাড়ল, না হে না, ওসব গবেষণা টবেষণা আমি ভুলে গেছি। আমি পৃথিবীকে বাঁচানাের চেষ্টা করছি।
তার মানে? পৃথিবী তাে দিব্যি বেঁচে আছে। মরার কে....।। মরছে। পৃথিবী মরছে। পরে টের পাবে। এ কাগজগুলাে কি কোনও প্রেসক্রিপশন? পৃথিবীর বাচার ওষুধ? ঠিক তাই। ওগুলাে কবিতা। তুমি পড়ে দেখতে পারাে। লােকটা মাথার হেমলেট খুলে মাথা চুলকে হতভম্বের মতাে বলল, কবিতা। হা। কবিতা। পড়াে।
লােকটা পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা পাক-খাওয়া কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে। কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। কিছু বুঝলে?
লােকটা অসহায় ভাবে মাথা নেড়ে বলল, কিছু বুঝতে পারছি না স্যার। কোনওদিন এ জিনিস পড়িনি। তােমার বয়স কত? একশ একান্ন বছর। বাচ্চা ছেলে।
আজ্ঞে হ্যা স্যার। আমাদের আমলে শিক্ষানিকেতনে এসব পড়ানাে হত না। শুনেছি তারও অনেক আগে কবিতা নামে কী যেন ছিল।
লােকটি নিরীহ এবং ভালমানুষ দেখে গণেশবাবু হুকুমের সুরে বলে উঠল, মনে মনে পড়লে হবে না। জোরে জোরে পড়াে।
লােকটা কাগজটার দিকে চেয়ে থেমে থেমে পড়তে লাগল, গ্রহটি সবুজ ছিল, গাঢ় নীল জল, ফিরােজা আকাশ....কোকিলের ডাক ছিল, প্রজাপতি, ফুলের সুবাস, আধাে আধাে দোল ছিল, টলে টলে হাঁটা ছিল, শিশু ভােলানাথ-শৈশব, ভাসায়ে জলে, কবি যে বৃহৎ হলে, নামিল আঘাত। থামাে, বুঝলে কিছু? লােকটি মাথা নেড়ে বলে, কিছুই বুঝিনি স্যার। একটুও না? | লােকটা মাথা নেড়ে বলল, শুধু মনে পড়ছে একসময়ে আমিও টলে টলে হাঁটতে শিখেছিলুম, গণেশ হতাশ হল। কবিতা তার ভাল হয়নি ঠিকই, কিন্তু না বুঝবার মতাে নয়।
লােকটা গণেশকে অভিবাদন করে চলে গেল, যেন একটু ভয়ে ভয়েই।
পরদিন সকালে রােজকার মতাে কবিতা লিখতে বসেছে গণেশ। এমন সময় একটা বড় সড় পিপে এসে সামনে নামল।।
স্যার। গণেশ তাকিয়ে দেখে, সেই লােকটি, সঙ্গে দুই মহিলা।
আমার স্ত্রী আর মাকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। আমার মা কবিতার ব্যাপারটা খানিকটা জানে। এরা দুজনেই কবিতা শুনতে চায়।
গণেশ অবাক এবং খুশি দুই ই হল। তবে কবিতা শুনিয়েই ছাড়ল না। গান শােনাল, ছবি দেখাল।
তিনজন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে রইল। • কিছু বুঝতে পারছাে তােমরা? তিনজনেই মাথা নেড়ে জানাল, না।
লােকটা বিনীত ভাবেই বলল, না বুঝলেও আমার মধ্যে কী যেন একটা হচ্ছে।
কী হচ্ছে? ঠিক বােঝাতে পারব না। পরদিন লােকটা ফের এল। সঙ্গে আরও চারজন পুলিশম্যান। এরা স্যার আমার সহকর্মী, কবিতা গান ছবির ব্যাপারটা বুঝতে চায়। গণেশ খুব খুশি, বােসাে বােসস।
পাঁচজন শ্রোতা ও দর্শক ঘণ্টা দুই ধরে গণেশের কবিতা শুনল, ছবি দেখল। কেউ ঠাট্টা বিদ্রুপ করল না। গম্ভীর হয়ে রইল।
পরদিন লােকটা এল না। কিন্তু জনা দশেক লােক এল, পুলিশ আছে, বৈজ্ঞানিক আছে, টেকনিশিয়ান আছে।
পরদিন আরও কিছু লােক বাড়ল। পরদিন আরও। আরও। এক সপ্তাহ পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব তার বিমান থেকে নামলেন গণেশের ডেরায়। এ আপনি কী কাণ্ড করেছেন? পৃথিবী যে উচ্ছন্নে গেল। লােকে গান গাইতে লেগেছে, কবিতা মকসাে করছে, হিজিবিজি ছবি আঁকছে।
গণেশ হােঃ হােঃ করে হেসে উঠে বলল, যাঃ, তাহলে আর ভয় নেই। দুনিয়াটা বেঁচে যাবে।

0 মন্তব্যসমূহ