Header Ads Widget

Ticker

6/recent/ticker-posts

Top News

কবিরাজের বিপদ

কবিরাজের বিপদ

Educational Blogs By SD Hasnat


চন্দ্রনাথবাবু কবিরাজ এবং শিশির সেন তরুণ ডাক্তার। রামদাসের ছােট্টবাজার পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু ডাক্তার, কবিরাজ, হােমিওপ্যাথে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। রােগীর চেয়ে ডাক্তারের সংখ্যা বেশি। তবে দেশটায় রােগবালাই নিতান্ত কমও নয়, তাই সবাই দু-মুঠো ভাতের যােগাড় করতে পারতাে কোনােরকমে। চন্দ্রনাথবাবুর বয়েস পঞ্চান্নছাপ্পান্ন, শিশির সেনের বয়েস ছাব্বিশসাতাশ। ওদের ডাক্তারখানা রাস্তার এপার-ওপার। রােগীপত্তর প্রায়ই থাকে না, দু'জনে বসে গল্প-সল্প করে। বয়সের তারতম্য যতই থাকুক, দু'জনে খুব বন্ধুত্ব। চন্দ্রনাথবাবু এসেছেন খুলনা জেলার হলদিবুনিয়া থেকে আর শিশিরবাবু যশাের শহর থেকে।

কাজকর্ম না থাকলে যা হয়ে থাকে, দু'জনে বসলেই তর্ক আর দ্বন্দ্ব। তর্কের • বিষয়বস্তু প্রধানতঃ মানুষের মৃত্যুর পর কি হয়, এই নিয়ে। | চন্দ্রনাথবাবু বলেন—তাদের গ্রামের একজন সাধু ছিলেন, তিনি ভূত নামাতে পারতেন। অনেকবার তিনি ভূতনামানাে-চক্রে উপস্থিত ছিলেন, নিজের চোখে ভূতের আবির্ভাব দেখেছেন, ভূতের কথা শুনেছেন নিজের কানে। সাধুটি একজন বড় মিডিয়াম, তার মধ্যে নাকি ভূতের দল পৃথিবীতে নিজেদের প্রকাশ করে । শিশির সেন বলেন রাবিশ! চন্দ্রনাথবাবু বলেন—তােমার বলবার কোনাে অধিকারই নেই এখানে! তুমি ছেলেমানুষ, কতটুকু তােমার অভিজ্ঞতা?

—অভিজ্ঞতার কোনাে দরকার হয় না, কমন-সেন্সের প্রশ্ন এটা।

কাকে বলচো কমনসেন্স? —মানুষ মরে গেলে আর বেঁচে থাকে না, কমনসেন্স। মরা মানেই না বাচা। —মরা মানে বৃহত্তর জীবনের মধ্যে প্রবেশ করা। —মরা মানেই নাবাঁচা। —মরা মানে জীবনটা বড় করে পাওয়া।

একদম বাজে। —দু-পাতা সায়েন্স পড়ে ভাবচো খুব সায়েন্স শিখে ফেলেচো? আসল সায়েন্সের কিছুই জানাে না, শেখাে নি।

বৈশাখ মাসের শেষ সপ্তাহ। এ বছরের মত এমন গরম এখানকার বৃদ্ধ লােকেরাও সেখানে কোনােদিন দেখে নি।

শিশির সেন বেলা সাড়ে পাঁচটার সময় এসে ডাক্তারখানা খুললেন। নাঃ, টিনের বারান্দা তেতে আগুন হয়েছে, এখনাে ঘরের ভেতর বসা সম্ভব নয়।

সামনের পানের দোকানীকে বললেন রাস্তাটাতে একটু জল ছিটিয়ে দিও অভয়—এখুনি লরী গেলে ধুলােয় চারিদিক অন্ধকার করে দেবে।

—ও কোবরেজ-মশায়। —কি? বাইরে আসুন না ! —যাই! —কতক্ষণ এলেন? —আমি আজ বাসায় যাই নি—দুপুরে এখানেই শুয়েছিলাম। —খেলেন কোথায়? -রামজীবন তরফদারের স্ত্রীর শ্রাদ্ধ গেল আজ কিনা। নেমন্তন্ন ছিল। —হুঁ। আসুন আমার বারান্দায়, চা খাবেন? -না মশায়। এই গরমে চা? দুপুরে লুচি ঠেসে? —দালদা ঘি-এর তাে? নইলে আর কোথায় পাচ্চে গাওয়া ঘি?

না মশাই, ও নেমন্তন্ন না খেয়ে ভালােই করেচি। খেলে অম্বল, না হয় ! পেটের অসুখ। আর এই গরমে!

চন্দ্রনাথবাবু ডাক্তার সেনের বারান্দায় এসে বসলেন এবং চাও খেলেন। পরে যথারীতি ভূতের গল্প শুরু হয়ে গেল।

চন্দ্রনাথবাবুর মধ্যে একটি সমরপটু আত্মা বাস করে, অবিশ্বাসীর সঙ্গে যুদ্ধ। করেই তার তৃপ্তি। শিশির সেন ভূতে বিশ্বাস করুক, না করুক, তাতে চন্দ্রনাথ কবিরাজের কি? জিনিসটা যদি সত্যিই হয়, তবে শিশির সেনের অবিশ্বাস সেটার কি হানি করতে পারে? | চন্দ্রনাথবাবু সেটা বােঝেন না যে এমন নয়, বােঝেন সবই। তবু যদি একজন অবিশ্বাসীকেও একদিন আলােতে এনে হাজির করা যায়। ইসলাম ও খৃষ্টধর্মের দিগ্বিজয়ী প্রচারকদের আশা যেন তার মধ্যে এসে বাসা বেঁধেছে। সত্যের। আলােতে এসব অসৎ মূখ ছেলে-ছােকরাদের আনতেই হবে, তবেই প্রকৃত শাস্তি দেওয়া হবে এই দাম্ভিকদের। স্বার্থবাদী ছােকরা দাম্ভিকের দল। দু-পাতা সায়েন্স পড়ে সব শিখে ফেলেচে।

চন্দ্রনাথবাবু জানতেন না শিশির সেনের মত ছােকরা তার সম্বন্ধে কি মনে করে। ওরা আড়ালে মুখ টিপে হেসে বলে-বুড়াে একদম সেকেলে। কুসংস্কারে ভরা। ইংরাজি তাে তেমন জানে না। কবরেজি করতাে, সংস্কৃত জানে একটু আধটু। দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে উনবিংশ শতাব্দীর। কি করি, মেশবার কোনাে লােক নেই এসব জায়গায়। কার সঙ্গে দুটো কথা বলি; নইলে ওই বুড়াে হাবড়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব আমার ? রামঃ।

একটু পরে হঠাৎ পশ্চিম দিগন্তে অন্ধকার করে একখানা বড় কালাে মেঘ উঠলাে এবং কিছুক্ষণ পরে কালবৈশাখীর ঝড় শুরু হয়ে গেল। চন্দ্রনাথ কবিরাজ নিজের কবরেজখানার জানলা দরজা বন্ধ করতে ছুটে গেলেন। ধুলােয় চারিদিক অন্ধকার হয়ে উঠলাে, বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু হলাে বটে কিন্তু বৃষ্টি বেশি না হয়ে ঝড়টাই হলাে বেশি।

ডাক্তারখানার সামনের অশথ-গাছের একটা ডাল ভেঙে উঠে এসে পড়লাে শিশির সেনের ডাক্তারখানার দরজার সামনে। বৃষ্টিভেজা সোঁদা মাটির গন্ধ বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ঠাণ্ডা—গরম একদম কমে এল।

চন্দ্রনাথ বললেন—আঃ বাঁচা গেল। শরীর জুড়িয়ে গেল যেন! কতদিন পরে একটু বৃষ্টি পড়লাে আজ মাটিতে।

চা খাবেন একটু? —তা হলে মন্দ হয় না। আনাও আর একটু।

এই সময় বৃষ্টিটা বেশ জোরেই এল। বর্ষাকালের বৃষ্টির মত। চন্দ্রনাথ কবিরাজের কবরেজখানার ঘরের চালের ছাঁচ বেয়ে অবিরল ধারে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলাে। রাস্তায় জল জমে উঠলাে আধ-ঘণ্টার ভেতর।

—বেশ বৃষ্টি হলাে, মুষলধারে না হলেও এ বছরের পক্ষে মন্দ নয়। চন্দ্রনাথবাবু বললেন—কই তােমার চা কোথায় গেল হে?

নবীন তাে গিয়েছে, বৃষ্টিতে আটকে পড়লাে রামুর দোকানে। ছাতি আছে আপনার?

—নাঃ।। —তবে আর কি হবে? জল ছেড়ে যাক। —আপনার ভুতুড়ে আলােচনা আরম্ভ করুন না !

নাঃ। –কেন, আজ এত বিরাগ কেন? আজই বরং ঠাণ্ডা বাদলার সন্ধ্যেতে একথা জমবে ভালাে।

—না হে, তােমরা অবিশ্বাস কর, হাসাহাসি কর, গভীর সত্যকে এভাবে বেনা-বনে ছড়াতে নেই।

—আপনার কথার প্রতিবাদ করতে বাধ্য হচ্ছি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে। গভীর সত্য কাকে বলছেন আপনি?

—মানুষের জীবন ও মৃত্যু অদ্ভুত রহস্যময়। গভীর রহস্য দিয়ে ঘেরা আমাদের এই জীবন। মানুষ মরে না। ভগবান অত্যন্ত করুণার আকর। এই হলাে গভীর সত্য। আরাে সংক্ষেপে শুনতে চাও? মানুষ অমর।

শিশির সেন হেসে বলে উঠলেন—তবে আপনি কবরেজি করেন কেন? মানুষ যদি অমর তবে?

—তার এই দেহটা অমর নয়, তাই কবিরাজি করি। আর এতদিন পরে কথাটা বলি, কবিরাজি করতে গিয়েই এই সত্যটা টেরও পেয়েছি।

—কি ভাবে?

এই সময় নবীন চাকর ভিজতে ভিজতে চা নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখলে। শিশির সেন বললেন—বিস্কুট কই রে ? আনিস নি? যা নিয়ে আয় চারখানা। —আসুন! দুটো সিগারেট নিয়ে আয় অমনি। এইবার বলুন কি ভাবে? চন্দ্রনাথ কবিরাজ চা খেতে খেতে গম্ভীর মুখে বললেন—নাঃ, ও সব নিয়ে ঠাট্টা নয়। বাদ দাও।

না না, রাগ করবেন না। কি করে সত্যটা টের পেলেন কবরেজি করতে গিয়ে বলুন না?—বেশ বাদলার সন্ধ্যেটা

-না, আমি বলবাে না। ঠাট্টার ব্যাপার নয় সেটা। তােমরা হাসবে আর আমি ভেবে আমার জীবনের অত বড় একটা অভিজ্ঞতা

—আমি কবে আপনাকে ঠাট্টা করেছি এ নিয়ে? সত্যি বলুন!

চন্দ্রনাথ কবিরাজের মনটা একটু নরম হয়ে এল। তিনি চা খেতে-খেতে শুরু করলেন নিম্নের গল্পটি।

—আমি নিজে যা দেখেছি তা অবিশ্বাস করি কি করে ? ঘটনাটা গােড়া থেকে বলি। পাকিস্তানে আমার বাড়ী ছিল খুলনা জেলার হলদিবুনিয়া গ্রামে। আমার বাবার নাম ছিল ত্রিপুরাচরণ শাস্ত্রী, সেকালের বড় নামডাকওয়ালা কবিরাজ ছিলেন তিনি।

বাবা বড় কবিরাজ ছিলেন, তার পসার পেলাম আমি। বাবা তখনাে বেঁচেই আছেন তবে কাজকর্ম করেন না। ইদানীং পক্ষাঘাত রােগে এক দিকের অঙ্গ অচল হয়ে গিয়ে শয্যাগত ছিলেন একেবারে। নামকরা সেকেলে কবিরাজের ছেলে হিসেবে বড় বড় বাধা ঘর ছিল, যারা অসুখ-বিসুখে আমাকে ছাড়া আর কোনাে চিকিৎসককে ডাকতাে না। | মালমাজীর পাকড়াশী জমিদার ছিলেন এমন একটি বাঁধা ঘর। সেবার কার্তিক মাসের শেষে জমিদার হরিচরণ পাকড়াশী ডেকে পাঠালেন—তার ছেলের অসুখ।

আমি গিয়ে দেখলাম ছেলেটির বিষম জ্বর, যাকে আপনারা বলেন টাইফয়েড। পনেরাে-ষােল বছর বয়সটা ও রােগের পক্ষে তত সুবিধাজনক নয়। আমাকে জমিদার বাবু হাতে ধরে অনুরােধ করে বললেন—আপনাকে এখানে থাকতে হবে কবিরাজ মশায়, যা লাগে আমি তাই আপনাকে দেবাে। ছেলেকে বাঁচিয়ে দিন।

আমি রােগীর অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। পেট-ফাপা, বুকে সর্দি-কাশি, নাড়ির গতি আপনারা যাকে বলেন ইন্টারমিটেণ্ট, ভুল বকা—সব খারাপ লক্ষণই বর্তমান। বাঁচানাে বড়ই কঠিন।

ভগবান ধন্বন্তরীকে স্মরণ করে কাজে লেগে গেলাম। সেদিন সন্ধ্যার পর নাড়ির অবস্থাটা ভালাে করে আনলাম। পেট-ফাপাও অনেকটা কমে গেল। ভুল বকুনি খানিকটা কমলাে। আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে বিশ্রাম করতে গেলাম রাত্রি এক প্রহরের পর।

পাকড়াশী জমিদারের বাড়ী দো-মহলা। বাইরে একদিকে দোলমঞ্চ, নাটমন্দির আর গােবিন্দ-মন্দির। ডাইনে সদর-কাছারি আর মহাফেজখানা। মহাফেজখানার দক্ষিণে আমলাদের থাকবার কুটুরি সারি-সারি অনেকগুলি। আমলাদের বাসার পূবদিকে বড় পুকুর। এই পুকুরের তিন দিকে বাঁধানাে ঘাট। পুব পাড়ের ঘাট বাইরের লোেকদের জন্যে, বাকি দুটি ঘাট আমলাদের জন্যে। | বাইরের মহলের মাঝখানে সদর দেউড়ি, এই দেউড়ির দু-পাশে দুই। বৈঠকখানা।

আমার বাসা নির্দিষ্ট হয়েছিলাে বাঁদিকের বৈঠকখানার পাশের বড় কুঠুরিতে। • সাদা ধবধবে চাদর পাতা, দুটো বড় তাকিয়া, মশারি খাটানাে, চমৎকার বিছানা করে দিয়ে গিয়েছে বাড়ীর ঝি। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমি বাইরে এসে অনেকক্ষণ রােগীর বিষয় চিন্তা করলাম, কাল সকালে কি কি অনুপান দরকার হবে, সেগুলাে মনে মনে ঠিক করে রাখলাম। তারপর এসে শুয়ে পড়তে যাবাে, এমন সময়ে দেখি জ্যোৎস্নালােকিত মাঠ দিয়ে কে একজন সাদা কাপড় পরা স্ত্রীলােক এদিকে আসছে। | রাত তখন অনেক। এত রাতে একা কে মেয়ে এদিকে আসচে বুঝতে পারলাম

। মেয়েটি এসে দেউড়ি দিয়ে বাড়ীর মধ্যে ঢুকলাে। পনেরাে মিনিটের মধ্যেই আবার সে বার হয়ে মাঠের দিকে চলে গেল। আমি ভাবলাম, আমলাদের বাড়ী থেকে যদি কোনাে স্ত্রীলােক রােগীকে দেখতে আসে, তবে এত রাত্রে আসবে কেন? একাই বা আসবে কেন?.....ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারােটা বাজলাে দেউড়িতে।

এমন সময়ে বাড়ীর ভেতর থেকে আমার ডাক এলাে—রােগীর অবস্থা খারাপ, শীগগির যেন যাই।

আমি তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম রােগীর শয্যার পাশে।

সত্যি রােগীর অবস্থা এত খারাপ হলাে কি করে? দেড় ঘণ্টা আগেও দেখে গিয়েচি রােগী বেশ আরামে ঘুমুচ্চে, এখন তার জ্বর হঠাৎ বড় নেমে গিয়েচে, অথচ চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল, নাড়ির অবস্থা খারাপ। জ্বর এত কম দেখে ঘাবড়ে গেলাম। বেজায় ঘামতে শুরু করেছে রােগী। মস্ত বড় সঙ্কটজনক অবস্থার মুখে এসে পড়লাে কেন এভাবে হঠাৎ?

তক্ষুণি কাজে লেগে যাই। আমিও ত্রিপুরা কবিরাজের ছেলে, উপযুক্ত গুরুর শিষ্য; দমবার পাত্র নই।

ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যে রােগীকে চাঙ্গা করে তুলে শেষরাত্রে ক্লান্ত দেহে বাইরের ঘরে বিশ্রাম করতে গেলাম।

এক ঘুমে একেবারে বেলা আটটা। উঠে রােগী দেখে এলাম, বেশ অবস্থা, কোনাে খারাপ উপসর্গ নেই। • সারাদিন এক ভাবেই কাটলাে। রােগীর অবস্থা দেখে বাড়ীর সকলে খুব খুশি। আমার সারাদিনের মধ্যে বিশেষ কোনাে খাটুনি নেই। দুপুরবেলা খুব ঘুম দিলাম। বিকেলে—এমনকি বড় পুকুরে মাছ ধরতে গেলাম আমলাদের মধ্যে একজন ভালাে বর্শেলের সঙ্গে। সেরখানেক একটা পােনা মাছও ধরলাম। মনে খুব ফুর্তি।

সেদিন রাত্রে বাইরের ঘরে শুয়ে আছি, এমন সময়ে দেখি দূরে মাঠের দিক থেকে যেন সেই স্ত্রীলােকটি এদিকে আসছে!

আজ সারাদিনের মধ্যে মেয়েটির কথা একবারও আমার মনে হয় নি। এখন আবার তাকে আসতে দেখে ভাবলাম ইনি নিশ্চয় এদের কোনাে আত্মীয় হবেন, • দূর গ্রাম থেকে দেখতে আসেন ঘরের কাজকর্ম সেরে। কিন্তু একা আসেন কেন?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল, কাল এই মেয়েটি রােগীকে দেখে চলে যাবার পরেই রােগীর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মনটা যেন খারাপ হয়ে গেল।

মেয়েটি দেউড়ি দিয়ে বাড়ীর মধ্যে ঢুকলাে দেখে আমার বুকের মধ্যে টিপ ঢিপ করতে লাগলাে কেন কি জানি। কান খাড়া করে রইলাম বাড়ীর দিকে।

আরামে ঘুমুতে যাচ্ছিলাম কিন্তু বিছানা ছেড়ে চেয়ারে বসলাম। ঘড়িতে ঠিক সে সময় বারােটা বাজলাে।

হঠাৎ দরজার কাছে কি শব্দ হলাে! মুখ তুলে দেখি, সেই স্ত্রীলােকটি একেবারে আমার ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছেন।

বেশ সুন্দরী, ধপধপে শাড়ী-পরা, চল্লিশের মধ্যে বয়েস, কপালে সিঁদুর।

আমার মুখ দিয়ে কোনাে কথা বেরুবার আগেই তিনি আমার দিকে আঙুল বাড়িয়ে হুকুমের সুরে বলতে আরম্ভ করলেন—শােনাে, তুমি এই ছেলেকে বাঁচাতে পারবে না, তুমি বাড়ী যাও।

আমার মুখ দিয়ে অতি কষ্টে বেরুলাে—কেন মা? আপনি কে?

আমার শরীর যেন কেমন ঝিমঝিম করে উঠলাে। সমস্ত ঘরটা যেন ঘুরচে। কেন এমন হলাে হঠাৎ কি জানি!

তিনি এক দৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে বললেন—শােনাে, আগুন নিয়ে খেলা কোরাে না। একে আমি নিয়ে যাবাে। এ আমার ছেলে। ওর বাবা আবার বিয়ে করেছেন আমার মৃত্যুর পর। সত্য ওকে দেখতে পারে না। বহু অপমান হেনস্থা করে। আমি সব দেখতে পাই। আমার স্বামী অনেক কথা জানেন না, কিন্তু আমি সব জানি। আমি আমার ছেলেকে নিশ্চয় নিয়ে যাবাে। কাল রাত্রেই নিয়ে যেতাম, তােমার জন্য পারি নি। তুমি চলে যাও এখান থেকে। ওকে বাঁচাতে পারবে না।

আমার সাহস ফিরে এল। হাত জোড় করে বললাম—মা, আমি বৈদ্য। আমার ধর্ম প্রাণ বাঁচানাে। আমার ধর্ম থেকে আমি বিচ্যুতি হবাে না কখনােই। আমার প্রাণ যায় সেও স্বীকার। একটা প্রস্তাব আমি করি মা। জমিদারবাবুকে সব খুলে বলি। অসুখ সারবার পরে তিনি ছেলেকে যাতে কোনাে ভালাে স্কুলের বাের্ডিং-এ রেখে দ্যান, এ ব্যবস্থা আমি করবাে। এ যাত্রা আপনি ওকে নিয়ে যাবেন না। যদি আবার ওর ওপর অত্যাচার হতে দ্যাখেন, তখন নিয়ে যাবেন আর আমিও আসবাে না। দয়া করুন জমিদারবাবুকে। তিনি বড় ভালবাসেন এই ছেলেকে।

তিনি বললেন---বেশ তাই হবে। তবে যদি কোনাে ভালাে ব্যবস্থা না হয়, তবে এবার আমি ওকে নিয়ে যাবােই, মনে থাকে যেন। | তখনই যেন সে মূর্তি মিলিয়ে গেল! সঙ্গে সঙ্গে আমার ডাক এল অন্দর থেকে, রােগীর অবস্থা খারাপ।

আমি তখনি ছুটে গেলাম। কাল যেমন অবস্থা ছিল, আজও ঠিক তাই। বরং একটু বেশি খারাপ। ভাের পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হলাে রােগীকে চাঙ্গা করতে।

সকালবেলা বাইরে যাওয়ার আগে জমিদারবাবুকে আমি- নিভৃতে ডেকে

বললাম কিছু মনে রবেন না জমিদারবাবু, আপনি এই ছেলেটিকে বাঁচাতে চান তাে?

জমিদারবাবু অবাক হয়ে বললেন—তার মানে?

তার মানে হচ্ছে এই। আপনি জানেন না ওই ছেলেটির ওপর ওর সম্মা বড় অবিচার করেন। কাল ওর মা আমার কাছে এসেছিলেন—শুনুন তবে। | সব কথা খুলে বললাম। জমিদারবাবু প্রথমটা অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন, তারপর হঠাৎ কেঁদে ফেললেন।

পরে বললেন—আমি কিছু কিছু জানি। বেশ এবার ও বেঁচে উঠুক, এর ব্যবস্থা আমি করবাে, আপনাকে আমি কথা দিলাম। ও সেরে উঠুক, জানুয়ারি মাস থেকে যশাের জেলাস্কুলের বাের্ডিং-এ ওকে আমি রাখবাে।

--কেমন ঠিক তাে? এবার কিছু হলে আমি কেন, কেউ আর ওকে বাঁচাতে পারবে না। --আমি কথা দিচ্চি কবরেজ মশাই।

—বেশ। নির্ভয়ে থাকুন, আপনার ছেলে সেরে গিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার ওকে পথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করবাে। আপনি পুরনাে চাল কিছু এর মধ্যে যােগাড়' করুন।

পরের দিন জ্বর ছেড়ে গেলাে রােগীর। শিশির সেন একমনে গল্প শুনছিলেন। বললেন—সেরে উঠলাে! —নিশ্চয়। —আর কোনােদিন দেখেছিলেন তার মাকে?

—কোনােদিন না। সে ছেলে এখন কলকাতায় থাকে, কিসের ভাল ব্যবসা করে শুনেছি।

জমিদারবাবু মারা গিয়েচেন। চললুম আমি, বৃষ্টি থেমেচে—ঘরে আলাে জ্বালি গে। চন্দ্রনাথ কবিরাজ উঠে গেলেন।



এ ধরণের আরো মজার মজার গল্প পড়তে ক্লিক করুন Educational Blogs এবং Subscribe করে পাশেই থাকবেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ