কবি সম্বর্ধনা
রামবাবু একজন মস্ত বড় সাহিত্যিক। তােমরা না জানলেও তােমাদের
দাদারা তার নাম জানেন। আর যদি কোন দিন মােহনবাগানের ম্যাচ্ • দেখতে গিয়ে থাকো তাকে তােমরা সেন্টারের ফ্ল্যাগের কাছে গ্যালারির সব চেয়ে নীচের ধাপে দেখে থাকবে। বয়স বেশি নয়, কি দেখতে একটি আস্ত গণ্ডার। যেমন থলথলে মােটা হুঁড়ি, তেমনি গাছের গুড়ির মতাে হাত-পা। তার ওপর ঘাড় নেই বললেই চলে, মাথাটা টাইপিসের ঘড়ির মতাে এই একটুখানি স্ত্রর মতাে কাধের ওপর এঁটে বসেছে। তবু তাে মাঠে তােমরা তাকে জামা গায়ে দেখে থাকবে; কিন্তু মােহনবাগানের ফোদা যেদিন ডারহামকে গােল দিল, সেদিন গায়ের জামা কুটি কুটি করে ছিড়ে ফেলে তার সেই প্রলয় নৃত্য দেখ নি? ও হরি! যেমনি জামা তার ছিড়ে ফেলা অমনি নৃত্যের প্রাবল্যে তার ভুড়ির খাঁজ থেকে পয়সা, আনি, বিড়ি ও দেয়াশলাইয়ের কাঠি টপাটপ ঝরে পড়তে লাগলাে। ঐ ভুড়িটি তার পৈতৃক মানিব্যাগ। পকেটকাটারা কোনকালেই ঐ বিরাট গােলকধাঁধার সন্ধান পাবে না। | চেহারা দেখেই যদি নাক সিটকোও তবে তােমাদের তারিফ করতে পারবাে । কেন না, পড়াে নি সেই কথাটা—যা কিছু ঝকঝক করে সব সােনা নয়। রামবাবু একজন মস্ত কবি। কে জানে হয় তাে একদিন তারই পদ্য তােমাদের মুখস্থ করে পরীক্ষা পাশ করতে হবে। এখনও না হয় তার নামটাম হয়নি কিন্তু কবিদের সুখ্যাতি নাকি তাদের মৃত্যুর পরেই হয়ে থাকে। অতএব রামবাবুরও সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে না। নাম একদম কিছু হয়নি তাই বা বলি কি করে? বাড়িতে স্ত্রী না হয় উঠতে বসতে মুখ ঝামটা দেয়, কবিতার খাতায় আগুন করে দুধ গরম করে, কিন্তু হীরুকে জানাে তাে? কাঁসারিপাড়ার সেই হীরু? মিত্র ইস্কুলে , সেকেণ্ড ক্লাসে সাত বছর যে বসে আছে। বা, হীরুকে জানাে না? আমি আর কী বলবাে, তােমাদের দাদাদের জিজ্ঞেস করাে—তাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই তার সঙ্গে পড়েছেন। সেই হীরু রামবাবুর একজন প্রধান ভক্ত—লাইনের সঙ্গে লাইন মিলিয়ে সেও রামবাবুর মতাে আকাশে উড়তে চায়। রামবাবুর জন্যে সে ম্যাচে গ্যালারিতে জায়গা রাখে এবং তার জন্যে জায়গা রাখবার অর্থ, হীরুকে তক্তার ফালিটার ওপর চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকতে হয়। তবু, অত বড় কবি তার পাশে বসবে সেইটেই হীরুর অহঙ্কার। খেলার মাঠে রামবাবু যে চীনে বাদাম খান তার খােসাগুলি হীরু সযত্নে কুড়িয়ে রাখে—কে জানে হয় তাে একদিন এই স্মৃতি চিহ্নগুলির ভয়ানক দাম হবে; হীরুকে কষ্ট করে আর ম্যাট্রিক পাশ করতে হবে না। | একদিন অতি কাচুমাচু হয়ে হীরু রামবাবুকে বললে, 'আমার দাদা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। তিনি একদিন আপনাকে আমাদের বাড়িতে চা খাবার ' কথা বলে দিলেন। গরীবের বাড়িতে পায়ের ধুলাে দেবেন দয়া করে? কথাটা বলি বলি করেও এতদিন বলতে পারছিলাম না, আপনার সময়ের ক্ষতি হয়ে যাবে। তবু যদি—' রামবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কে তােমার দাদা?
চোখ কপালে তুলে হীরু বললে, বা, দাদাকে চেনেন না! তিনি একজন মস্ত সমালােচক-আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। লােকে আপনাকে এখনাে ঠিক বুঝতে পারে নি কিন্তু দাদা বলেন, আপনি রবি ঠাকুরের চেয়েও এক হিসেবে বড় কবি। | রামবাবু গলে গিয়ে বললেন, “সেই কথাটা দেয়ালে প্ল্যাকার্ড মেরে তােমার দাদাকে রটিয়ে দিতে বল না। যাবাে একদিন। এমন গুণীর সঙ্গে দেখা না করে পারি? কালকেই যাবােখনকী বলাে?”
খুশিতে গদগদ হয়ে দুহাত কচলাতে কচলাতে হীরু বললে, আপনার দয়া। কাল ম্যাচ্ নেই—ধরুন এই ছ'টার সময়। আমি জণ্ড বাবুর বাজারের স্টপে আপনার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি আসবেন শুনলে আমাদের পাড়ায় হৈচৈ পড়ে যাবে। যাবেন দয়া করে। গণমান্য আরাে দু’পাঁচজনকে ডাকা যাবেন।
পরদিন বিকেলে তার সাজগােজের বিরাট আয়ােজন দেখে রামবাবুর স্ত্রী বললেন, ‘এত সেজে গুজে যাওয়া হচ্ছে কোথায় ?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এসেন্সের শিশির মধ্যে কর্কটা ডুবিয়ে নিয়ে গোঁফের ওপর বারে বারে ঘসছিলেন, বললেন, “দেখ তাে, নাপতে ব্যাটা ঘাড়টা কেমন চেঁচেছে?
মুখ ঘুরিয়ে স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনতে পাই ?”
‘আর বলাে না। তােমরা তাে কবির সম্মান করতে শিখলে না কিন্তু তাই বলে বাংলা দেশের সব পাঠক তাে তােমাদের মত মুখ নয়, তারা আমায় বুঝতে শিখেছে। জানলা দরজা ভেজিয়ে কত কাল আর সূর্যের আলাে ঠেকিয়ে রাখা। যায় বল?
স্ত্রী বললেন, তা তাে বুঝলাম, কিন্তু রাত্রে আজ মাংস রাঁধবাে ভেবেছিলাম। সকাল সকাল ফিরাে, বুঝলে?
“দুত্তোর তােমার মাংস!' রামবাবু ধমকে উঠলেন, 'এদিকে আমার চায়ের নেমন্তন্ন, আর উনি যাচ্ছেন মাংস রাঁধতে। পৃথিবীর কোনও খবর তাে আর রাখাে না। আমার ভক্তরা মিলে আমাকে আজ অভিনন্দন দিচ্ছে। অভিনন্দন মানে জানাে? বানান করাে দিকি? হ্যা তােমাকে বােঝাতে গেলেই হয়েছে।” | ‘অত কথা শুনতে চাই না। রাত্রে কোথাও থেকে যেন খেয়ে এসাে না।'
খেয়ে আসবাে না মানে?’ রামবাবু একেবারে ক্ষেপে উঠলেন। আমার কিনা চায়ের নেমন্তন্ন—হ্যা, হ্যা, মাত্র একবাটি চা নয়, কেইক, পেইসট্টি, স্যাণ্ডউইচ ক্রীম রােল, ক্রীম ক্যাকার নাম শুনেছ কোন কালে? রাত্রে আমি কিছু খাব। । বুঝলে? মাৰ্বল-টপ টেবলে বসে খাওয়া—তােমায় আর কি বােঝাবাে?” রামবাবু ভবানীপুরের বাস ধরলেন। কিন্তু জগুবাবুর বাজারের কাছে নেমে হীরুকে কোথাও দেখা গেল না। ব্যস্ত হয়ে লাভ নেই, আরাে খানিকক্ষণ দাঁড়ানাে যাক। লােকজন যােগাড় করা, গ্যাস জ্বালানাে, খাবার দাবার ফরমাস করাসব তাে একা ওকেই করতে হচ্ছে। একটা কোন্ গাড়িই বা না ওকে ঠিক করতে হয়! রামবাবু গ্যাস পােস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ঐ, ঐ আসছে হীরু। ও-ও নতুন কবি হচ্ছে কিনা, তাই সময় সম্বন্ধে ঠিক ধারণা নেই। রামবাবুর কাছে এসে হীরু বললে, “এই নামলেন বুঝি বাস থেকে? আসুন, আসুনবাস যা থেমে থেমে চলে! রামবাবু বললেন, কিন্তু এখন টি টাইম ছেড়ে যে ডিনার টাইম হয়ে গেল!' হীরু হাত কলাতে কলাতে বললে, “হেঁ হেঁ, তাতে কি? চলুন।
প্রকাণ্ড বাড়ি। হীরুরা বনেদি বড়লােক। কিন্তু দরজায় না ঝুলছে আমপাতার মালা না দেখা গেল কলাগাছ পোঁতা। লােকজনের সাড়াশব্দ নেই। কোথাও এতটুকু চাঞ্চল্য দেখা গেল না। উদ্বিগ্ন হয়ে রামবাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'আর কেউ এখনাে আসেন নি বুঝি?
হীরু বিনয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে বললে, “দাদা সবাইকে বারণ করে দিলেন। বললেন, কবির সঙ্গে আলােচনায় বাজে লােকের ভিড় বাড়িয়ে কাজ নেই।'
মুখখানা হাঁড়ি করে রামবাবু হীরুর সঙ্গে উঠোন পেরিয়ে একটা ঘরে ঢুকলেন। ছােট নােংরা ঘর-কাঠের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। মেঝের ওপর ফরাস পেতে খালি গায়ে একটা লােক বসে আছে। লােকটার কোলের কাছে একটা জলচৌকি—তাতে সে একটা কাগজ পেতে কি জানি সব লিখে চলেছে। বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি। রামবাবু ঘরে ঢুকতেই প্রকাণ্ড ছায়া পড়ে ছােট ঘরটা প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল। লােকটা চোখ তুলে তাকাল। হীরু পরিচয় করিয়ে দিলে, 'দাদা, ইনিই হচ্ছেন রামবাবু। আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।'
হীরুর দাদা গায়ের ওপর তাড়াতাড়ি কেঁাচার খুঁটটা জড়াতে জড়াতে বললে, 'বসুন বসুন। যা হীরু, শীগগির যা, ঠাকুরকে জল চাপাতে বলে দিয়ে আয়।”
হীরু বাড়ির ভেতর চলে গেল, আর রামবাবু জড়সড় হয়ে মেঝের ওপরই ব'সে পড়লেন। নিরাশ হয়ে লাভ নেই, ভক্তের দল নাই বা এল, তবু পেট পুজোই বা এ দুর্দিনে কয়জন করাতে চায়! তাই মুখে হাসি টেনে রামবাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'কি লিখছেন? আমার কবিতা সম্বন্ধে কোন আলােচনা নাকি?'
কাগজটা তাড়াতাড়ি উলটে রেখে হীরুর দাদা বললে, 'না, না, একটা সাবসট্যান্স লিখছি। পরীক্ষা এসে পড়েছে।
‘পরীক্ষায় পরীক্ষা কিসের? , আর বলেন কেন, ম্যাট্রিকটাই এই বছর আষ্ট্রেক ফেল মারছি। এই যে হীরু এসেছিস, জলের কন্দুর?
হীরু বললে, বৌদি ধমকে দিলে, বললে—উনুন থেকে ভাতের হাঁড়ি বারে বারে নামানাে যাবে না।
হীরুর দাদা বললে, আচ্ছা, উনি না হয় একটু বসবেন। কি বলেন, এক পেয়ালা চা খেয়ে গেলে আর ক্ষতি কি? নতুন আর কি লিখলেন? দেখুন, আপনার সম্বন্ধে আমি একটা দীর্ঘ সমালােচনা লিখব।' রামবাবু উৎসুক হয়ে বললেন, ‘কি নিয়ে? আমার কবিতা না গল্প?” ‘ওসব বাজে আলােচনা আমি লিখি না। আমি লিখব আপনার নাম নিয়ে। আপনার সমস্ত মাহাত্ম্য ঐ নামে। আপনি যে সব্বাইকার চেয়ে শ্রেষ্ঠ তা আপনার নামেই বােঝা যাচ্ছে।' - ‘আমার নামে!’ রামবাবু বিস্ময়ে হাঁ করে রইলেন!
হীরুর দাদা বলতে লাগল, এই দেখুন না, ছাগলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে রামছাগল, পাখীর মধ্যে রামপাখী, দার মধ্যে রাম-দা, ছেলেদের মাসিকপত্রের মধ্যে রামধনু—তেমন কবির মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আপনি-রামকবি! কী সত্যি কি না?”
রামবাবুর তাে চক্ষু স্থির! হীরু কতক্ষণে খাবারের থালাটা নিয়ে আসে (কেন নিতান্ত দেশী মতেই তার অভ্যর্থনা হচ্ছে। তারই আশায় তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। হীরু এসে বসল। রামবাবু বললেন, ‘রাত হয়ে যাচ্ছে, হীরু। মুখের কথাটা লুফে নিয়ে হীরুর দাদা বললে, “হ্যা, আর ওকে বসিয়ে রেখ । উনি তাে আর তােমার মতাে ভবঘুরে লোেক নন, সময়ের দস্তুরমতাে দাম আছে। এতক্ষণে দু'চারটে কবিতা গজিয়ে যেত—কি বলুন? * হীরু বললে, 'বা, আর একটু বসুন। চা আসছে। চা আসছে। আঃ! রামবাবু কোমরের কসিটা নামিয়ে ভুড়িটাকে একটু আগ্লা দিলেন।
কিন্তু উড়ে চাকরের হাতে নেহাৎই এক পেয়ালা মাত্র চা। তার পেছনে বহু দুর পর্যন্ত আর কাউকে দেখা গেল না।
হীরু গর্জে উঠলাে, “কি রে, চায়ে দুধ দিনি একেবারে? দে, আমার কাছে দে।' বলে চায়ের কাপটা চাকরের হাত থেকে তুলে নিয়ে হীরু ফের ভিতরে চলে গেল। হীরু যখন গেছে, তখন অমনি শুধু হাতে আসবে না।
হীরুর দাদা কাগজটা রামবাবুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, 'আপনি তাে এত সব লেখেন, দয়া করে আমার এই সাবসট্যান্সটা লিখে দিন না। দাঁত ফোটায় কার সাধ্যি? এখুনি আবার মাস্টারমশাই এসে পড়বেন।' | এত বড় ধাড়ির আবার মাস্টার! রামবাবু বললেন, 'আমার এখন সময় হবে ।
হীরুর দাদা বললেন, 'তা যা বলেছেন। মিছিমিছি হীরু আপনাকে অমনি বসিয়ে রেখেছে কেন? চায়ে দুধ একটু কম হলে কী হয়?
চায়ে নাকি ক্ষুধা নষ্ট হয়, সেই ভরসায় রামবাবু এক চুমুকে তলানি সুদ্ধ পেয়ালাটা সাবাড় করে ফেললেন। হীরুর দাদা হীরুকে বললে, “কিরে তুই, ভদ্দরলােক এলএত বড় নামজাদা রাম লেখক, তাকে কিছু খাবার পর্যন্ত খাওয়ালি না? তা, বাজারের বাজে খাবারে খালি পেট খারাপ করে। নিন, আমার এই পান নিন। মিঠে পান, আস্ত একটি এলাচ দিয়ে সাজা।' ব'লে হীরুর দাদা ট্যাক থেকে ডিবে বার করে খুলে একরত্তি একটি পান রামবাবুর দিকে এগিয়ে দিলে।
পানটি মুখে পুরতেই হীরুর দাদা বললে, ওকে তুই কতক্ষণ বসিয়ে রাখবি? এতে তুই বাংলা সাহিত্যের কি ক্ষতি করছিস কিছু খেয়াল আছে?”
হীরু রামবাবুকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললে, 'যে চায়ের পেয়ালায় আপনি আজ চুমুক দিলেন সেটা আমি সােনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখব।'
রামবাবু বললেন, ‘শুধু শুধু অতগুলি টাকা খরচ করবে কেন? তা দিয়ে। বরং আমার শ্রাদ্ধের ব্যবস্থাটা কর। বলে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু উদরে আগুন জ্বলছে। ঐ আধ কাপ চা যেন অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। এখন তিনি। কী করেন? বাড়ি ফিরবার জো নেই। বাড়ি ফিরে এখন খেতে চাইলে তার। সমস্ত কবি সম্মান মাঠে মারা যাবে। লজ্জায় আর মুখ দেখাতে পারবেন না।
হায়, বাড়িতে আজ মাংস হচ্ছিল! ঘ্রাণে সমস্ত ঘর বাড়ি আমােদিত হয়ে আছে। বাটিতে বাটিতে সবাই হয়তাে কত ফেলে ছড়িয়ে খাচ্ছে! থালার ধারে ধারে চিবােনাে হাড়ের সব পাহাড় উঠে গেল। আর তার ভাগ্যে কিনা আধ কান্ কেলেকুষ্টি, তেতাে চা! | রামবাবু দিগবিদিক না তাকিয়ে একটা খাবারের দোকানে ঢুকে পড়লেন। প্রকাণ্ড একটা ঠোঙা সাজিয়ে রাজ্যের খাবার নিয়ে তিনি গিলতে সুরু করলেন। কিন্তু দাম দেবার সময় পকেট হাতড়ে—আঁ! মানিব্যাগ! মানিব্যাগ কোথায় ? ভদ্রলােক সাজতে গিয়ে টাকা-পয়সা যে চামড়ার থলিতে করে তিনি পকেটে রেখেছিলেন? সর্বনাশ! এখন কি হবে? চায়ের কাপ সােনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখবার জন্য আলগােছে হীরু হয় তাে সেটা তুলে নিয়েছে। দোকানদাররা সব তাকে
জাপটে ধরল, বললে, “খেয়ে দাম না দিয়ে ঠকাবার মতলব! পুলিশ ডাকব | এক্ষুণি।
‘পালাবে না! তবে হাতের তােমার ঐ আংটি, শার্টের ঐ বােতাম রেখে যাও। এমন ঢের জোচ্চোর আমরা দেখেছি।'
অতএব ঐ সব দামী আংটি আর বােতাম দিয়ে রামবাবু ছাড়া পেলেন। বাড়ি ফিরলে স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “কি হলাে?
রামবাবু বললেন, “জোয়ানের আরােকের শিশিটা শীগগির দাও তাে! যা এক গাদা খাইয়ে দিয়েছে! মাংস, চপ, পােলাও—অত শত কি নাম জানি? রাজ্যের খাতায় নিজের নাম দস্তখত করতে করতে আঙ্গুলগুলাে ব্যথা হয়ে গেছে।' বলে রামবাবু আঙ্গুল মটকাতে লাগলেন।
‘আঁা, তােমার আংটি কোথায় ? রামবাবু হেসে বললেন, 'আমার এক ভক্ত এক নাগাড়ে আমার কবিতা এত মুখস্থ বলতে লাগল যে তাকে ওটা প্রাইজ দিয়ে ফেলেছি। নইলে যে মানা থাকে না। তবে ছেলেমানুষ ভক্ত কাল ভাবছি গােটা আড়াই টাকা দিয়ে ওটা ছাড়িয়ে নিয়ে আসব। কি বল?' ‘আর দিয়েছে!' রামবাবু বললেন, না দিলে তাে বয়ে গেলাে। ভারি তাে একটা আংটি ! যা সম্মান আজ পেলাম, পৃথিবীর কোন অর্থভাণ্ডারে তার উপযুক্ত দাম নেই। বলে তিনি প্রচুর হাসতে লাগলেন।


0 মন্তব্যসমূহ