Header Ads Widget

Ticker

6/recent/ticker-posts

Top News

লঙ্কাদহন পালা ।। শিক্ষণীয় মজার গল্প

লঙ্কাদহন পালা

funny story, Educational Blogs


পটলা ইদানিং নাটক নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। পটলা বলেননাটকই

সমাজের দর্পণ। বুঝলি? নাটকের উন্নতি করা দ-দ—

পটলার আবেগ চাপলে ওর জিবটা আলটাকরায় আটকে যায়। হোঁৎকা বলে-ব্রেক ফেল করেছে ওর।

ফটিক অবশ্য কালােয়াতি গান নিয়ে থাকে। তিন বছর ধরে মাত্র তিনখানা গান নিয়েই এন্তার বমি করে চলেছে। বলে রাগ-রাগিণীর ব্যাপার, সাধনার দরকার।

ইদানিং পটলার নাটকে সে সুর সংযােজনা করেছে। সুতরাং ফটিক বলেথাম দিকি হোঁৎকা। নাটক দিয়েই এবার পঞ্চপাণ্ডব ক্লাব সমাজসেবার কাজ করবে।

পটলাও বলে—সিওর।।

এর মধ্যে ম্যারাপ বেঁধে পটলার নতুন নাটক ‘আমরা কারা' মঞ্চস্থ হয়েছে। পটলার ছােটকাকা আমাদের প্রধান পৃষ্ঠপােষক। পাড়ায় গাছে-দেওয়ালে পটলার নাটকের পােস্টার পড়েছিল। হোঁৎকাও কোনাে অরিজিন্যাল বাস্তুহারার রােলকরেছে খাঁটি বাঙাল ভাষায়। ওটা ছাড়া অন্য ভাষায় ওর বাল ফোটে না। দারুণ করেছিল। আমার অভিনয়ের জন্য একটা রৌপপদক ঘােষণা করা হলাে, পটলার নামে ঘােষণা করা হলাে তিনখানা, অবশ্য তার একখানাও এতাবৎ হস্তগত হয়নি। ওরা কবুল করেই চুপ করে গেছে। তবুও আমরা এবার জোর কদমে নাট্য আন্দোলন ভিড়ে পড়েছি।

পটলা সেদিন খবরটা আনল। ওর পিসতুতাে ভাই এসেছে হাড়ভাঙ্গা বসন্তপুর থেকে, ওদের অজ গ্রামেও এখন নাকি রীতিমত সাংস্কৃতিক চেতনার মশাল জ্বলে উঠেছে। গ্রামের বাৎসরিক ধর্মরাজ পূজো উপলক্ষে তারা কলকাতা থেকে আমাদের নাটকের দলকে নিয়ে যেতে চায়।

পটলার ‘আমরা কারা’ নাটকের সুখ্যাতি তারাও শুনেছে। তাই ধেয়ে এসেছে। হোঁৎকা বলে—হালায় অজ পাড়াগায়ে যাবি পটলা?

হোঁকা কলকাতেই মানুষ হয়েছে। পাড়াগ্রাম সম্বন্ধে তার একটা এলার্জি রয়ে গেছে। পটলা নাটকের জন্য ডাক পেয়ে বােধহয় সুমেরু কুমেরুতেও চলে যাবে। সে বলে--কেন যাবি না? পল্লীর অন্ধকার ত-তমশার মাঝেও নাটকই পথ প্রদর্শন করতে প—প—আমি পাদপূরণ করি—পথ দেখাতে পারে।

পটলা এবার ইংরাজীতে মন্তব্য করেকরেকট। তাই এ আমন্ত্রণ আমরা নেবই। . ফটিক বলে—নিশ্চয়ই। এ আমাদের পূণ্যবত। যেতেই হবে সেখানে। হোঁৎকা বলে—কুন ঝামেলা হইব না তাে?

পটলার পিসতুতাে ভাই-এর চেহারাটা শীর্ণ, মাথাটা বেশ বড়সড়। তাতে বাবরি চুলও রয়েছে। দেখতে অনেকটা খ্যাংরা-কাঠির মাথায় আলুর দমের মতােই। নামটাও বেশ জবরদস্ত। চঞ্চলকুমার।

চঞ্চলকুমার বলে ওঠে—তাদের দেশজ বীরভূমী ভাষায়, কুন শালাে কি করবেক হে? ঘেঁটে লাদনার বাড়িতে উদের পিণ্ডি চটকাই দিব না? রং চালাকি। তবে পটলা, একটো ডাংসার লিয়ে যেতে হবে। পালার আগে দু'একটো লাচ লাগাই দিবি।

আমি বলি—নাচ! আমাদের নাটকে ওসব তাে নেই। ইঙ্গিত-ধর্মী নাটক তাে। চঞ্চল বলে—লাচ কিন্তুক চাই হে! বােতল নিত্য, জিপসী লাচ, না হয় ডিসকো লাচ চাই কিন্তুক!

পটলা বলে—হবে। ডিকো নাচও হবে। চঞ্চল খুশি হয়ে বলে—তাহলে তাে আর কথাই নাই। ব্যস। ওই কথাই রইল। সামনের মাসের তেরাে তারিখ সকালের বাসে ইখান থেকে যেয়ে দুবরাজপুরের আগে হাড়ভাঙ্গা বসন্তপুরের মােড়ে নেমে পড়বি। উখান থেকে আমরা লিয়ে যাবাে। হু !

যাবার গাড়িভাড়া আর ড্রেস-মেকআপ বাবদ শ দুয়েক টাকাও দিয়ে গেল। চঞ্চল বলে-লাইট-ফাইট সিউড়ি থেকে আসবেক। ফকাস যা দিক দেখে লিবি বটে পটলা। লাল, লীল, বাসন্তী রং যা চাইবি সব পাবি। হোঁকা চুপ করে আছে। চঞ্চল বলে চলেছে—আর খাওয়ন-দাওয়নও হবেক জোর

এবার আহারের নাম শুনে হোঁৎকা একটু চঞ্চল হয়। শুধায় সে-মাছমাংস থাকবাে নিশ্চয়? | চঞ্চল বলে—হেই দ্যাখাে? দশ বারাে সেরী ঘেঁটো রুই খাওয়াবাে হে। আর মাংস? একটো ইয়া খাসী রেখেছি, গাদাড়ে দিব। আর হাড়ভাঙ্গার দইও দেখবা, হাঁড়ি ফাটাই দাও, দই টুকবেন ও পড়বেক নাই। ত্যামন দই দিব হে।

ঘনঘন রিহার্সেল হচ্ছে। আর টেপরেকর্ডারে ডিসকো মিউজিকের তালে তালে কানা বিশেও এবার নাচের মহড়া জোরদার করে তুলেছে।

পটলা তখন টিম নিয়ে এবার দূরপাল্লার বাসে যাবার আয়ােজন করছে।

এর আগে এত দূরে অভিনয় করতে আসিনি। শালবন—অজয় নদী পার হয়ে বাসটা চলেছে, বেলা তখন প্রায় এগারােটা। কনডাকটার একটা মাঠে মধ্যে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বলে—হাড়ভাঙ্গা বসন্তপুর মােড়। নেমে পড়ুন।

আমরা স্যুটকেস, ব্যাগ, ওদিকে সাজের বাক্স-টাক্স নিয়ে হড়বড়িয়ে নামলাম, বাসও আমাদের বাতিল মালপত্রের মতাে এই ধাপধাড়া গােবিন্দপুরের মাঠে ফেলে দিয়ে চলে গেল।

একটা পুরােনাে বটগাছ-এর নীচে ছােট্ট একটা চায়ের দোকান মতাে। বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরী দুটো মাচা, ও-দুটোই বেঞ্চের কাজে লাগায় দোকানদার। | হোঁৎকা বিবর্ণ মুখে বিড়বিড় করে—ক্ষুধা পাইছে—কইল মাছ-মাংস, ভরপেট দইও দিবে। হালায় ওগাের পাত্তাই দেহি না রে পটলা!

রােদও বেড়ে উঠেছে। দেখছি এদিক ওদিকে। পটলাও বিপদে পড়েছে। হঠাৎ তিন চারজন ছেলেকে সাইকেল নিয়ে আমাদের দিকে আসতে দেখে চাইলাম। ওদেরই একজন এগিয়ে এসে শুধােয়—কলকাতা থেকে আসা হচ্ছে? এ্যা! • ছেলেটার গোঁফজোড়াটা বেশ জমজমাট। গলাটাও একটু কর্কশ। পটলা আশাভরে বলে—হ্যা। আপনারা হাড়ভাঙ্গা বসন্তপুর থেকে আসছেন? চঞ্চলদা পাঠিয়েছে?

অন্যজন বলে—উসব চলবেক নাই হে। হাড়ভাঙ্গা বসন্তপুরে ঢুকবা নাই তুমরা। ইখান থেকেই পরের বাসে পানাগড় চলে যেতে হবে।

অবাক হই—সেকি? এতদূর এলাম নাটক করতে, শেষকালে ফিরে যেতে

ছেলেটা এবার গোঁফে চাড়া দিয়ে বলে, কেনে-মেনে বুঝি না। গাঁয়ে ঢুকলে হাড় গুঁড়াে করে দোব। গাঁয়ের নামটা জানাে তাে?

এবার চমকে উঠি। হাড়ভাঙ্গা নামটা শুনে তখনও ঠিক বুঝিনি।

এবার মনে হয় সত্যিকার ওইসব কাজ এরা করে তাই ওই নামটাই বহাল হয়েছে এ গ্রামের।

হোঁকা এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। ওই সব শাসানি শুনে এবার হোঁৎকাও এগিয়ে আসে। খিদের চোটে জ্বলছিল আগেই, এবার ওদের কথায় জ্বলে উঠে হোঁৎকা ওদের একজনকে ধরে ফেলেছে। বলে হোঁৎকা—কি কইলা? হালায় কলকাতার কুলেপাড়ার জিনিস, আমাগাের ওই একখ্যান গাঁয়ের নাম কইরা ভয় দেখাবাে? আমাগের হাড় ভাঙ্গার আগে তােমার গোফখানই খুইলা মু!

ছেলেটা চমকে উঠেছে। ফটিক নির্বিরােধী টাইপের ছেলে। বিদেশে এসে এসব ঝামেলা সে পছন্দ করে না। তাই ওকে হোঁকার হাত ছাড়িয়ে বলে— থাম হোঁৎকা। যাও ভাই তােমরা।

ছেলেটা ছাড়া পেয়ে তার সহচর দুজনকে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে বলে–ঠিক আছে। বললাম যাবেন না, তারপরও যদি যান তখন দেখা যাবে।

আশরাও ভাবনায় পড়েছি। গলা শুকিয়ে আসছে। কানা বিশের নাচের পােজ থেমে গেছে। সে বলে-কাজ নাই গাঁয়ে গিয়ে, ফিরেই চল। | সেই চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছি। দোকানদারই জানায়-ফেরার বাস সেই বেলা তিনটেয়।

অর্থাৎ সারা দুপর শুধুমাত্র লেড়াে বিস্কুট চিবিয়ে বসে থাকতে হবে এখানে। ওদিকে সেই ছেলেরাও দেখছে আমাদের।

গতিক ভালাে বুঝছি না। তাই বলি—ফিরেই চল পটলা। চঞ্চলদারাও কেউ এল না, গ্রামের ছেলেরা এসে শাসাচ্ছে, ওখানে নাটক করতে যাওয়া ঠিক হবে না।

হোঁৎকা গর্জায়—ওগাের শাসানি ছুটাই দিমু। এমন সময় দেখা যায় দূরের গ্রাম থেকে শ'খানেক লােকজন ছেলেপুলে লাঠি উচিয়ে মত্ত কলরবে বড় রাস্তার দিকে ধেয়ে আসছে। ভয় পেয়ে যাই। মনে হয় এবার ওই ছেলেগুলাের কথা না শােনার জন্যই বােধহয় মারধােরই করতে আসছে তারা।

নাটক করতে এসে পটলার জন্যে প্রাণটা বেঘােরে দিতে হবে তা ভাবিনি। বলি-পটলা! এবার মেরে ফেলবে রে!

হঠাৎ দেখি ওই দলবলকে ছুটে আসতে দেখে ওদিকে তিনটি ছেলে উঠি কি পড়ি ভাবে সাইকেলে চেপে বড় রাস্তা দিয়ে দৌড় মারলাে, ওই মাঠ থেকে আগত দলেরও কিছু ছেলে ওদের তাড়া করেও ধরতে পারলাে না। | ভিড় থেকে চঞ্চলদা এবার বের হয়ে এসে বলে, আইচ হে তুমরা। বুঝলা ভায়াগায়ে শালােরা কিষ্ট যাত্রা করাবেক;তাই লিয়ে তক্কো, কিষ্ট যাত্রা হবেক লাই, কলকাতার নাটক হবে। শালােদের হঠাই দিলম। চলাে= ( বিবাদের নমুনা কিছুটা বুঝেছি। ওরা তাই আগে এসে আমাদের তাড়াতেই চাইছিল। ফটিক বলে—ওখানে আর নাটক করে কাজ নাই পটলা। টেপরেকর্ডার, লাইট-ফাইট যদি ভেঙ্গে দেয়?

ভাববার কথা। তাই বলি, ঠিক বলেছিস ফটিক। পটল, তিনটের বাসে ফিরে চল। আর নাটক করে কাজ নাই! * গোবরাও সায় দেয়। কানা বিশে তাে আগেই তার মতামত জানিয়েছে। আমাদের অন্যতম অভিনেতা নিতুও তাই বলেসেই ভালাে। ওদের গােলমালের মধ্যে আমরা কেন যাবাে? | ভােটের জোরে পটলাও এবার মত বদলায়। তাহলে ফিরেই চল।

ভরপেট মাছ-মাংস ফকাবার দুঃখে হোঁৎকা ম্রিয়মাণ। কিন্তু ও পক্ষ এবার অন্য মূর্তি ধরে। সিটকে মতাে একজন লাঠি উঁচিয়ে বলে—ফিরে যাবে? এ্যা রং ঢালাকি পেয়েছাে? এ গায়ের নামটা জানাে? হাড়ভাঙ্গা বসন্তপুর। হাড় ভেঙ্গে পাউডার বানিয়ে দোব। মানে মানে গাঁয়ে চলাে—পেলে করাে, ব্যস্। বাপের সুপুরের মতাে ফিরে যাবে।

অন্যজন। গর্জে ওঠেনা হলে কলকাতার মুখ আর দেখতে হবেক লাই, লাশগুলান দীঘির পাঁকের লীচে পুইতে দিব।

পটল, এবার আর্তনাদ করে ওঠে চঞ্চলদা? চঞ্চল এখন গদিচ্যুত। সেই বীরপুঙ্গবই শােনায়—চঞ্চল কি করবেক হে? গাঁয়ের মাথাটি হেট করে চলে যাবে, তা সইব লাই। চলাে | অজ পাড়াগ্রাম। আমাদের নিয়ে গিয়ে ওদের ক্লাবঘরে তুলেছে। উচু পুকুরের পাড়সেখানে খড়ের লম্বা ঘরটাই ওদের লাইব্রেরি-কাম-ক্লাবঘর, গ্রামের বাইরেই। | ওদের দলপতির নাম ভূষণ। সে-ই বলে—আজ গােলমালে মাছটাছ ধরানাে হয়নি, ছাগল কাটাও হলাে না। এদের ‘মহেশবাবুর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে আন। কাল দেখা যাবে। ক্লাবের নিচের পুকুরে স্নান করে গ্রামের মধ্যে এক ভদ্রলােকের বাড়িতে খেতে গেলাম। হোঁৎকা খেতে বসেই গুম হয়ে গেছে। লাল বােগড়া চালের ভা। হড়হড়ে বিরিকলাই-এর ডাল, ডিংলার তরকারী, তৎসহ আলুপােস্ত আর। টম্যাটোর উগ্ৰ টক।

হোঁৎকা বলে—পটলা, হেই চঞ্চলদা কনে গ্যাল র্যা, ঘেঁটো রুই, মাংস হালায় গুল দিবার জায়গা পাই নাই।।

চঞ্চলদাকে ওরা পাত্তাই দেয়নি, এখন আমরা এদের ডিরেক্ট চার্জে এসে গেছি। হাঁড়িতে জিইয়ে রাখা কই মাছের মতাে। হোঁৎকা কোনােরকমে খাওয়া। সেরে উঠলাে। | সন্ধ্যার পর থেকেই আটচালায় লােকের ভিড় শুরু হয়েছে। ফাঁকা মাঠে। চট, তালাই পেতে ওরা সপরিবারে বসেছে, কেউ দিনভাের মাঠে ধান কেটে এসেছে গান শুনতে। ভটভট শব্দে জেনারেটার চলছে। তার লাল নীল বেগুনি আলােয় কানা বিশে গাে গাে চশমা পরে বাজানাে ডিসকো বাজনার তালে বেতালে বিকট ভাবে লম্ফ-ঝম্প করে চলেছে।

চড় চড় শব্দে দর্শকবৃন্দের হাততালি পড়ে। কারা আবার চিৎকার করে এঙ্কোর, এঙ্কোর—অর্থাৎ আবার লাগাও।

আমি নজর রেখেছি সেই আগেকার দল যেন কোনাে গােলমাল না করে। অবশ্য সে ব্যাপারে ভূষণ-চঞ্চলদারাও সজাগ। তাদের দেখাও যায় না। | এবার পটলার অমর অবদান ‘আমরা কারা' নাটক শুরু হলাে। ইঙ্গিত-ধর্মী নাটক, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্রেফ পা-হাত ছুড়ে গতিময়তা, নাটকীয় মুহূর্ত আনতে চেষ্টা করছি, আর নাটকের চরিত্রগুলােও দুর্বোধ্য, পটলাই তার মানে জানে না। (অবশ্য মানে টানে শুধােলে পটলাও চটে যায়) তবু ওই চট-তালাই-এর শ্রোতারা কেবল হাততালি দিয়ে চলেছে। কলকাতার নাটক না বুঝতে পারলে নাকি তাদের গেইয়া বলবে। তাই ঘনঘন মাথা নেড়ে হাততালি দিচ্ছে।

পটলার সরল পুটির মতাে জীর্ণ বুকের খাঁচাটা ফুলে ওঠে। বলে সে দেখছিস কেমন নাটক বােঝে এরা?

অবশ্য এ নাটক বিশেষ কোথাও পুরােপুরি ভাবে শেষ করতে পারিনি। কোথাও ইট, কোথাও আধলা, কোথাও টম্যাটো, কোথাও পচা ডিম, আবার কোথাও স্রেফ চিৎকার করে পিনি দিয়ে আমাদের ড্রপ ফেলতে বাধ্য করিয়েছে। এখানে সেটা হলাে না। নাটক শেষ হলাে। পটলা আর গােবরা দুজনে কুস্তির পােজে দাঁড়ালাে—লাল আলাে পড়লাে, আর হাততালি-সিটি সমানে চলেছে।

পটলা খুব খুশি, পুরাে নাটক হয়েছে। বলে সে—রিয়েল নাট্যপ্রেমীদের জায়গা। কাল ভাবছি আর একটা নাটক 'তাপখানা রুটি' করবাে।

হোঁৎকা রাতেও খেতে বসে দেখে কুমড়াের ঘাট উইথ সজনে ডাটা, আর চিংড়িমাছের টক।

হোঁৎকা গর্জে ওঠে—তুই একাই নাটক করােস। আমরা কাল ভােরেই চইলা যামু। এই হালায় ঘেঁটো রুই, এই তগাের মাংস।

রাত হয়েছে। একটু ঝিমুনি এসেছে। হঠাৎ দরজাটা কাদের বাইরে থেকে বন্ধ করতে দেখে চাইলাম। সারা গ্রাম নাটক দেখে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। নিশুতি গ্রাম। হঠাৎ বাইরে থেকে কাদের দরজা বন্ধ করতে দেখে চমকে উঠি।

এ্যাই! কেকে? সাড়া নেই। দরজাটা বাইরে থেকে শিকল তােলা। খােলার উপায় নেই। হঠাৎ দেখা যায় খােলা জানলা দুটোর সামনে দুটো আংরা ভর্তি মালসা, আগুনের তাপ গনগন করছে, আর সেই জ্বলন্ত আবার উপর কি ফেলে যা দিয়ে সমস্ত ধোঁয়া দুটো জানলা দিয়ে এই বদ্ধ ঘরে ঠেলে দিচ্ছে।

পরক্ষণেই বুঝতে পারি ব্যাপারটা। পটলা বিকট শব্দে হাঁচছে—গােবরাও। উৎকৃষ্ট পাটনাই সুপক্ক লঙ্কার গুঁড়াে দিচ্ছে ওই মালসায় আর লঙ্কাপােড়ার ঝাঝালাে সব ধোয়াটা এসে ঢুকছে এই বদ্ধ ঘরে।

নাক জ্বালা করছে, চোখমুখ দিয়ে জল ঝরছে আর হাঁচি। ঘরসুদ্ধ সবাই হাঁচছি, চিক্কার করার মতাে দমও নেই। মনে হয় এই বদ্ধ ঘরে হাঁচতে হাঁচতেই শেষ হয়ে যাবাে। পটলার নাটকের জন্য শহীদ হতেই হবে বােধ হয়।

ধোয়ার ঘরটা ভরে উঠেছে। ভিতরে একটা চাপা আর্তনাদ, হাঁচির শব্দ ওঠে। হোঁকা প্রাকৃতিক ব্যাপারে বাইরে এসেছিল, হঠাৎ ওই লঙ্কাপােড়ার ব্যাপার দেখে সে হকচকিয়ে গেছে। তারার আলােয় দেখা যায় রাস্তায় প্রথম দেখা সেই গোফওয়ালা ছেলেটাই তার দলবল নিয়ে এসেছে এবার এদের সযুত করতে।

ওরা তাক বুঝে ধোয়া দিচ্ছে, হোঁৎকাও অতর্কিতে লাফ দিয়ে পড়ে ওর পুরুষ্ঠ গোঁফজোড়াটা হাতে পাক দিয়ে দড়ির মতাে ধরেছে, অন্যটার মাথার লম্বাচুল ধরে দুটোকে মালসার আগুনে মাথাগুলাে এনে ফেলতেই ওরাও লঙ্কার

ঝে বিকট শব্দে হেঁচেও ওঠে। | অন্য দুজন বেগতিক দেখে মালসা ফেলে হাওয়া।

এ দুটো বন্দী ইদুরছানার মতাে চি চি করছে আর হচছে বিকট শব্দে। ঘরের ভিতর থেকে পটলা-গােবরারা চিৎকার করছে।

সারা গ্রামের লােকজন জেগে গেছে, আবার লাঠি সড়কি নিয়ে তারা চিকার করে এসে হাজির হয়।

লম্বা চুলওয়ালা তখন প্রাণের দায়ে হোঁৎকার হাতে একগােছা চুল রেখে পালাবার জন্য লক্ষ্য দিতে টাল খেয়ে উঁচু পাড় গড়িয়ে শীতের রাতে ভাদুরে পাকা তালের মতাে বহু নিচে পুকুরের কাদাজলে পড়েছে।

গ্রামের জনগণ তখন পুকুর ঘিরে তার সন্ধান করছে আর গোঁফওয়ালা ওই বাহারি গোজের জন্যই বামাল ধরা পড়ে গেল লঙ্কাগুঁড়াে আংরার মালসা সমেত।

এবার মুক্ত হয়ে আমাও ঘােষণা করি—এখানে কোনাে ভদ্রলােকের বাস নাই। ডেকে এনে নাটক করিয়ে প্রাণে মারতে চায় এরা।

এবার গ্রামের মহেশবাবু আরও দুচারজন মাতব্বর এগিয়ে এসে ভূষণদেরই কড়া স্বরে বলেন—এভাবে গ্রামের বদনাম হতে দেবাে কেন? | ভােরবেলাতেই জাল নেমেছে পুকুরে। ক্লাবঘর থেকে মহেশবাবুর চকমিলানাে বাড়ির বৈঠকখানার ফরাসে এসেছি। আর আট দশ কেজি নধর মাছ, তাজা খাসী, আর সেই হাঁড়িভাঙ্গা জমাট দই—সব-কিছুর আয়ােজন করেছেন মহেশবাবু।

পটলা বলে—তাহলে আর একপালা হােক ‘আধখানা রুটি। আমি ভয়ে ভয়ে শুধােই—আর ‘লঙ্কা দহন হবে না তাে? মহেশবাবু বলেন—সে হনুমানদের মেরে হাড় ভেঙ্গে ফেলে রেখেছি।

শুনে চুপ করে যাই। হাড়ভাঙ্গা বসন্তপুর থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরুতে পারলে বাঁচি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ